আপত্তি উপেক্ষা করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ই-পাসপোর্ট সেবা
ফাইল ছবি
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের অতি সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ও বায়োমেট্রিক তথ্য একটি বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট আইনি আপত্তি এবং বিদ্যমান আউটসোর্সিং নীতিমালা উপেক্ষা করেই এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে।
সাইবার ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের জন্য ‘ভয়ংকর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর ফলে দেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মসনদ ও বায়োমেট্রিক তথ্যের মতো রাষ্ট্রীয় গোপনীয় ডেটাবেস বিদেশি নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেলের সঙ্গে মালয়েশিয়া-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ফশওয়া এসডিএন বিএইচডি’-এর স্থানীয় অপারেটর ‘ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিইং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি, দুবাই’-এর একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল কেবল মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রদান কার্যক্রমে সহায়তা। চুক্তির কোথাও ই-পাসপোর্ট বা অন্যান্য কনসুলার সেবা পরিচালনার কোনো বিধান বা অনুমোদনের উল্লেখ নেই। তবুও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো একটি বিবেচ্যপত্রের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয় উক্ত প্রতিষ্ঠান যেন ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য কনসুলার সেবাও পরিচালনা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমআরপি ও ই-পাসপোর্ট প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কাঠামোর সেবা। ই-পাসপোর্ট কার্যক্রমে নাগরিকের আঙুলের ছাপ, আইরিশ স্ক্যান, মুখমণ্ডলের ছবি, ডিজিটাল স্বাক্ষরসহ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয় এবং এসব তথ্য ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সার্ভারের সঙ্গে রিয়েল-টাইমে সংযুক্ত থাকে। চুক্তির বাইরে গিয়ে এই কার্যক্রম বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া মানে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল নিরাপত্তাকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলা।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও লিখিত। ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে পাসপোর্ট সেবা দেওয়া যাবে কি না সে বিষয়ে মতামত চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। এর জবাবে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো মতামত স্মারকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয় যে বিদ্যমান আউটসোর্সিং নীতিমালা-২০২৫ কার্যকর থাকা অবস্থায় বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে এ ধরনের আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়ের সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: পে-স্কেলের দাবিতে আজ বিক্ষোভ, কাল প্রতিবাদ সমাবেশ
একই সঙ্গে বলা হয়, বৈদেশিক মিশনগুলোতে রাজস্ব খাতের জনবল ও স্থানীয় ভিত্তিক কর্মী থাকায় বিদ্যমান জনবল দিয়েই পাসপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান সম্ভব এবং এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো নীতিমালারও প্রয়োজন নেই।
অর্থ বিভাগের উপসচিব কাজী লুতফুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে এই অবস্থান সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই স্পষ্ট আপত্তির পরও প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (কনসুলার) তানভীর আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে আবারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়, ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিইং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি যেন ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ সব কনসুলার সেবা পরিচালনা করতে পারে। এরপর ১৪ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমআরপি সেকশন থেকে স্বরাষ্ট্র সচিবকে ই-মেইলের মাধ্যমে একই অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব চিঠি ও ই-মেইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির বিষয়টি কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।
এরই মধ্যে চুক্তিতে উল্লেখ না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে দাবি করেছে।
২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা গোলাম এম এ আর চিশতী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্বরাষ্ট্র সচিবকে জানানো হয় যে দুবাইয়ে ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও অন্যান্য প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন কেবল ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্টের প্রযুক্তিগত দলের মাধ্যমে সরঞ্জাম ইনস্টলেশন, কনফিগারেশন ও নেটওয়ার্ক সংযোগ বাকি রয়েছে।
অন্য একটি চিঠিতে বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেল, দুবাইকে জানানো হয় যে এনরোলমেন্ট স্টেশনের সঙ্গে কনসুলেটের ই-পাসপোর্ট সার্ভারের রিয়েল-টাইম সংযোগ ও সুরক্ষিত ডেটা ট্রান্সফারের জন্য অবকাঠামোগত সংস্কার কাজ চলমান, যা প্রতিষ্ঠানটি নিজেই ‘অতি সংবেদনশীল কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও অসন্তোষ ও নীরব প্রতিবাদ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুরু থেকেই তারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম তুলে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। বহিরাগমন উইংয়ের অতিরিক্ত সচিবকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। তাদের মতে, মিশনের নিজস্ব জনবল দিয়েই আরও নিরাপদ ও পেশাদারভাবে এই সেবা দেওয়া সম্ভব এবং তাই এমআরপি-সংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তি কেবল চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত সীমিত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
নথি ও সূত্রগুলো আরও জানাচ্ছে, এই সংবেদনশীল অনুমোদনের পেছনে রাজনৈতিক চাপও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ ছিল এবং ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি মালয়েশিয়ায় একই ধরনের প্রক্রিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান। এরপর তার অনুপস্থিতিতে একটি বড় রাজনৈতিক দলের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র চুক্তির মেয়াদ দেখিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেছে যে বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেল, দুবাই ও ফশওয়া এসডিএন বিএইচডির স্থানীয় অপারেটরের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি ২০২৬ সালের ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকায় ওই সময়ের মধ্যে ই-পাসপোর্টসহ অন্যান্য কনসুলার সেবা আউটসোর্সিং করা যেতে পারে।
তবে আইন ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল চুক্তির মেয়াদ থাকলেই চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত কাজ দেওয়া যায় না; প্রতিটি সেবার জন্য পৃথক নীতিগত অনুমোদন, আর্থিক সম্মতি ও আইনি ভিত্তি অপরিহার্য।
প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট কার্যক্রমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার বা নেটওয়ার্ক অ্যাকসেস থাকলে তথ্য চুরি, অপব্যবহার কিংবা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে নাগরিক ডেটা চলে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. তানভীর হাসান জোহা এ সিদ্ধান্তকে ‘ভয়ংকর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, একবার এই নজির তৈরি হলে গোটা দেশের নাগরিক তথ্যই ঝুঁকিতে পড়বে এবং আউটসোর্সিংয়ের ফলে সেবার খরচ বাড়ার পাশাপাশি জবাবদিহিও কমে যাবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর মনে করেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট আপত্তি, কার্যকর নীতিমালা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরের আপত্তি উপেক্ষা করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনসুলার সেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তার মতে, এর পরিণতিতে শুধু দুবাইয়ে অবস্থানরত প্রবাসী নয়, পুরো দেশের নাগরিকদের তথ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে একাধিকবার স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








