তনু হত্যায় নতুন মোড়, মিলল চতুর্থ ব্যক্তির ডিএনএ
ফাইল ছবি
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ এক দশক (নয় বছরের বেশি সময়) পর তদন্তে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। থমকে থাকা এই আলোচিত মামলার জট খুলতে শুরু করেছে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের পুনঃপরীক্ষায় পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।
তনুর পোশাক থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ নমুনা পুনঃপরীক্ষায় আগে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও, এবার নতুন করে আরও একজনের রক্তের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। ফলে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারজনে। দীর্ঘ সময় পর প্রকাশ্যে আসা এই ডিএনএ রিপোর্টের নতুন তথ্যের পাশাপাশি সম্প্রতি সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত এক জ্যেষ্ঠ ওয়ারেন্ট অফিসারকে গ্রেফতার এবং আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ ক্রসম্যাচের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই মামলার তদন্তে নতুন গতি এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রবিবার (১৭ মে) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকার কল্যাণপুর কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, কয়েক মাস আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) চিঠি দিয়ে তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাস আগে সিআইডি জানায়, পূর্বে শনাক্ত হওয়া তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর পাশাপাশি একই নমুনায় আরও একজনের রক্তের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ২০১৭ সালে প্রথম ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর তথ্য সামনে আসে। নতুন করে আরেকজনের রক্তের অস্তিত্ব শনাক্ত হওয়ায় মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তবে তিনি এটিকে “সম্পূর্ণ নতুন তথ্য” না বলে “পূর্ববর্তী ফরেনসিক বিশ্লেষণের সম্প্রসারিত ফলাফল” হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে রাতেই সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস এলাকার অদূরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর থেকেই অভিযোগ ওঠে, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। সেনানিবাসের মতো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় এ ধরনের ঘটনা কীভাবে ঘটল তা নিয়ে সারা দেশে তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি ওঠে।
আরও পড়ুন: তনু হত্যা মামলায় ১০ বছর পর প্রথম গ্রেফতার, সাবেক সেনাসদস্য রিমান্ডে
ঘটনার পরদিন তনুর বাবা, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। শুরুতে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরবর্তীতে সিআইডি মামলাটির তদন্ত করলেও দীর্ঘ সময়েও হত্যার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
মামলার তদন্তের অন্যতম বিতর্কিত দিক ছিল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন প্রকাশিত দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করতে পারেনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। এতে জনমনে আরও সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে ডিএনএ রিপোর্ট।
২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানায়। সেই সময় ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি হলেও কারও সঙ্গে তা আনুষ্ঠানিকভাবে মিলিয়ে দেখা হয়নি বলে অভিযোগ ছিল। একই বছরের অক্টোবর মাসে তনুর মায়ের সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তিকে ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদও করে সিআইডির একটি দল। তবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
পরবর্তীতে তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর মামলার তদন্তভার সিআইডি থেকে পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআই সদর দপ্তরের পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।
তদন্তে নতুন মোড় আসে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। আদালতে তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের সময় পিবিআই তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ প্রোফাইল পুনরায় পরীক্ষা ও ক্রসম্যাচ করার অনুমতি চায়। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করার পর গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় পিবিআই।
হাফিজুর রহমান সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার। ২০২৩ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে সিগন্যাল ইউনিটে কর্মরত ছিলেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের নির্দেশে বর্তমানে তিনি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
গ্রেফতারের পর ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সেটি তনুর পোশাকে পাওয়া নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত সেই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ডিএনএ ক্রসম্যাচের জন্য আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনের নমুনাও সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সর্বশেষ ফরেনসিক তথ্য ও ডিএনএ বিশ্লেষণ মামলাটির দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তনু হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা হত্যামামলায় পরিণত হয়েছে। এক দশক পার হলেও হত্যার বিচার না হওয়ায় এখনও ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। নতুন ফরেনসিক তথ্য সামনে আসায় আবারও আলোচনায় এসেছে সেই প্রশ্ন তনু হত্যার প্রকৃত রহস্য কি এবার উন্মোচিত হবে?
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








