নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৪৩, ১৮ মে ২০২৬
আপডেট: ১৭:৫৬, ১৮ মে ২০২৬

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় আসছে স্বতন্ত্র আইন

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় আসছে স্বতন্ত্র আইন

ছবি: সংগৃহীত

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-কে সম্পূর্ণ নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় এনে একটি আধুনিক, পেশাদার এবং স্বচ্ছ এলিট ফোর্স হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিগত সময়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ফলে ভাবমূর্তি সংকটে পড়া এই বাহিনীর সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট ও সুসংহত নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। 

সোমবার (১৮ মে) দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলায় র‍্যাব সদর দপ্তরে বাহিনীর ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ মতবিনিময় সভা ও প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আগামী দিনে এই বাহিনী সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে তার সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রস্তাবিত নতুন আইনে বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের পরিধির পাশাপাশি কঠোর জবাবদিহিতার বিধান যুক্ত করা হবে, যা সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক তদারকি করা হচ্ছে।

র‍্যাবের বর্তমান আইনি সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘদিনের ‘অ্যাডহক’ কাঠামোর সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে র‍্যাব সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাধীন আইনের অধীনে পরিচালিত না হয়ে মূলত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) আইনের একটি বিশেষ ধারার ওপর ভিত্তি করে অন্তর্বর্তীকালীন বা অ্যাডহক ভিত্তিতে চলে আসছিল। একটি রাষ্ট্রীয় এলিট ফোর্স সুদীর্ঘকাল এমন অস্থায়ী ও জোড়াতালির কাঠামোয় চলতে পারে না এবং এভাবে পরিচালনা করা মোটেও সঠিক ছিল না। এই আইনি ত্রুটি দূর করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘আইন প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করেছে। নতুন এই আইনের খসড়া চূড়ান্ত হলে সেখানে বাহিনীর ক্ষমতা, দায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা থাকবে। এলিট ফোর্স হিসেবে কার্যকারিতা বজায় রাখতে বর্তমান র‍্যাবের সমস্ত জনবল, ইকুইপমেন্টস, লজিস্টিকস, ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিস এবং সম্পদ এই নতুন আইনের অধীনে প্রতিস্থাপিত হবে। তবে সংস্কারের পর বাহিনীর নাম 'র‍্যাব' থাকবে নাকি অন্য কোনো নতুন নামে এই এলিট ফোর্স গঠন করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে সরকার বিবেচনা করে জানাবে।

বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এলিট ফোর্সটির রাজনৈতিক অপব্যবহার এবং এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খোলামেলা বক্তব্য দেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা তার একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার উগ্র বাসনা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এই বাহিনীকে পুতুলের মতো ব্যবহার করেছিলেন। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণেই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‍্যাবের ওপর আমেরিকার স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা এসেছিল, যা এখনো বহাল রয়েছে। তবে কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আইনবহির্ভূত ও বিপথগামী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ পুরো প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকজন কর্মকর্তার অপরাধের দায় পুরো বাহিনী নিতে পারে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না যা ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‍্যাব, বিজিবি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

দোষী কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, বিপথগামী কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী, প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়। ইতোমধ্যেই স্ব-স্ব বাহিনীর আইনি কাঠামো অনুযায়ী প্রচলিত আইনে দায়ী কর্মকর্তাদের কঠোর তদন্ত ও জবাবদিহিতার আওতায় আনার অনুশাসন দেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, নতুন আইনের অধীনে যখন এই বাহিনীকে সংস্কার, পুনর্গঠন কিংবা নতুনভাবে রিনেম (নামকরণ) করা হবে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচকভাবে পুনর্বিবেচনা করবে।

আরও পড়ুন: ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন

ভবিষ্যতে এই এলিট ফোর্সকে পুনরায় কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না এমন নিশ্চয়তার প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান সরকারের বিগত তিন মাসের নিরপেক্ষ কর্মকাণ্ডের উদাহরণ টেনে ইংরেজি প্রবাদ ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ (সকাল দেখেই দিন বোঝা যায়) উল্লেখ করেন। 
তিনি বলেন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে পুলিশ, র‍্যাব কিংবা অন্য কোনো বাহিনীকে কোনো প্রকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা কোনো দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। জনগণের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন এই বাহিনীগুলোর একমাত্র লক্ষ্য এবং বর্তমানের এই নিরপেক্ষ চরিত্রই ভবিষ্যৎ পথচলার গ্যারান্টি। 

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ, বিমান), আনসার, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে গঠিত এই সম্মিলিত এলিট ফোর্সটি দীর্ঘ সময় ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এমনকি জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এটি বিলুপ্তির সুপারিশ করলেও বর্তমান সরকার এটিকে বিলুপ্ত না করে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তরের পথ বেছে নিয়েছে।

মতবিনিময় সভায় বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত এবং ইলিয়াস আলীসহ সকল নিখোঁজ ব্যক্তির বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনি জটিলতা ও সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান। 

তিনি বলেন, পূর্ববর্তী গুম কমিশনের মূলত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট আইনগত এখতিয়ার ছিল না, যার ফলে গুমের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে আইনি সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। এই জটিলতা নিরসনে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রীসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মামলা দায়ের করেছেন। সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুয়াল (আইসিটি) আইন সংশোধন ও শক্তিশালীকরণের কাজ করছে। এই বিশেষ আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন হলে গুমের শিকার, গুমের হুমকিপ্রাপ্ত কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রতি হওয়া সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় এই আদালতেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সরাসরি দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার পাবেন।

র‍্যাব সদর দপ্তরের এই গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এবং র‍্যাব মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উপস্থিত কর্মকর্তারা সরকারের এই আইনি সংস্কার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়