আইডাহোর মাঝ আকাশে সংঘর্ষে বিধ্বস্ত দুই মার্কিন যুদ্ধবিমান
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের ‘মাউন্টেন হোম এয়ার ফোর্স বেস’-এ আয়োজিত একটি বিমান প্রদর্শনীতে (এয়ার শো) মাঝ আকাশে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ও বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেছে। তবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছেন বিমান দুটিতে থাকা মোট চারজন ক্রু সদস্য। মাঝ আকাশে সংঘর্ষের পরপরই তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইজেক্ট করে প্যারাসুটের মাধ্যমে নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করতে সক্ষম হন। বর্তমানে তাদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে সামরিক কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের সামরিক তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় রোববার (১৭ মে) পশ্চিম আইডাহোর বোইসি শহর থেকে প্রায় ৫০ মাইল (৮০ কিলোমিটার) দক্ষিণে অবস্থিত মাউন্টেন হোম বিমান ঘাঁটিতে ‘গানফাইটার স্কাইজ এয়ার শো’-এর দ্বিতীয় ও শেষ দিনের প্রদর্শনী চলছিল। দুপুরের দিকে বিপুলসংখ্যক দর্শকের সামনে আকাশে অত্যন্ত নিখুঁত ও ঝুঁকিপূর্ণ ফরমেশন ফ্লাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাক্রোবেটিক কৌশল প্রদর্শন করছিল মার্কিন নৌবাহিনীর ওয়াশিংটন হুইডবে দ্বীপভিত্তিক ইলেকট্রনিক অ্যাটাক স্কোয়াড্রন-১২৯-এর দুটি বোয়িং ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ যুদ্ধবিমান। কসরত দেখানোর একপর্যায়ে বিমান দুটি আকাশে অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসে এবং আকস্মিকভাবে একে অপরের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী শেন অগডেন জানান, তিনি বিমান দুটির কাছাকাছি ওড়ার দৃশ্যটি ভিডিও করছিলেন এবং ভেবেছিলেন কসরত শেষে বিমান দুটি আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু আকস্মিকভাবে সেগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে এবং বিমান দুটি আলাদা না হয়ে মাঝ আকাশেই একসাথে আটকে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে। মাটিতে আছড়ে পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে চারজন ক্রু সদস্যই বিমান থেকে সফলভাবে ইজেক্ট করেন এবং আকাশে চারটি প্যারাসুট খুলে যায়। এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিমান দুটি এয়ার বেস থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে ঘাঁটির বাইরে মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং বিশাল এক আগুনের গোলায় পরিণত হয়ে বিস্ফোরিত হয়। দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকা কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলীতে ঢেকে যায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রোমহর্ষক ঘটনার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনার পরপরই বিমান ঘাঁটি জুড়ে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। নিরাপত্তার স্বার্থে মাউন্টেন হোম এয়ার ফোর্স বেস কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে পুরো সামরিক ঘাঁটিতে জরুরি ‘লকডাউন’ জারি করে এবং এয়ার শোর বাকি থাকা সমস্ত আয়োজন ও প্রদর্শনী বাতিল ঘোষণা করা হয়। সিলভার উইংস অব আইডাহোর বিপণন পরিচালক কিম সাইকস এবং ৩৬৬তম ফাইটার উইংয়ের জনসংযোগ দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সামরিক ঘাঁটিতে থাকা অন্য কোনো দর্শক বা বেসামরিক ব্যক্তি আহত হননি।
মার্কিন নৌবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত বোয়িং ইএ-১৮জি গ্রাউলার যুদ্ধবিমান দুটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রতিটি বিমানের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮২৩ কোটি ১০ লাখ টাকা)। ফলে এই দ্বৈত বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণের দাবি ইরানের
দুর্ঘটনায় পতিত ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ যুদ্ধবিমানটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘এফ/এ-১৮এফ সুপার হর্নেট’ ফাইটার জেটের একটি বিশেষায়িত এবং অত্যন্ত উন্নত সংস্করণ। এটি মূলত অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনা (Electronic Warfare), শত্রুপক্ষের রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা জ্যামিং করা এবং শত্রুসেনার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করার মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল মিশনে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের বিমানে চালনা ও নিখুঁত কৌশল প্রদর্শনের জন্য পাইলটদের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের দূরদর্শিতা ও পারস্পরিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়, যেখানে সামান্যতম ভুলের মাশুল হতে পারে মারাত্মক।
মাঝ আকাশে দুটি যুদ্ধবিমানের এমন সরাসরি সংঘর্ষের পরও সব ক্রুর অক্ষত অবস্থায় বেঁচে থাকাকে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত বিরল ও অবিশ্বাস্য ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিমান নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ জেফ গুজজেটি এই ঘটনার কারিগরি দিক বিশ্লেষণ করে জানান, সাধারণত মাঝ আকাশে সংঘর্ষের পর বিমান সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে টুকরো হয়ে যায় এবং ক্রুদের বের হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু এক্ষেত্রে বিমান দুটি ভিন্ন কোণ থেকে একে অপরকে আঘাত করায় তারা আকাশে কিছু সময় একসাথে আটকে ছিল, যা ক্রুদের ইজেক্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবান সময় এনে দিয়েছিল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তিনি একে যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং পাইলটের ত্রুটি বা জাজমেন্টাল এরর বলে ধারণা করছেন।
অপরদিকে, সেফটি অপারেটিং সিস্টেমের সিইও জন কক্স জানান, এয়ার শোতে অংশ নেওয়া পাইলটরা সাধারণত অত্যন্ত দক্ষ ও সেরা মানের হয়ে থাকেন, তবে সেখানে ভুলের সুযোগ থাকে শূন্যের কোঠায়। মার্কিন আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, দুর্ঘটনার সময় আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার ও দৃশ্যমান ছিল, তবে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৯ মাইল (৪৭ কিলোমিটার), যা আকাশে বিমান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
মাউন্টেন হোম বিমান ঘাঁটিতে ২০১৮ সালের পর এটিই ছিল প্রথম বড় ধরনের কোনো ‘গানফাইটার স্কাইজ’ ইভেন্ট। এর আগে ২০১৮ সালের প্রদর্শনীতে একটি হ্যাং গ্লাইডার দুর্ঘটনায় একজন পাইলট নিহত হয়েছিলেন এবং ২০০৩ সালেও এখানে একটি থান্ডারবার্ডস বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল, যদিও সেবার পাইলট বেঁচে যান।
ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব এয়ার শোজ-এর প্রেসিডেন্ট জন কুডাহি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ২০০টি এয়ার শো অনুষ্ঠিত হয় এবং কঠোর নিয়মকানুনের কারণে এভিয়েশন নিরাপত্তা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যেখানে বার্ষিক মৃত্যুর গড় ছিল ৩.৮ জন, তা ২০১৭ সালের পর থেকে কমে মাত্র ১.১ জনে নেমে এসেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ বা ২০২৫ সালেও মার্কিন এয়ার শোতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি এবং ১৯৫২ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দর্শক নিহতের রেকর্ড নেই। মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের নৌ বিমান বাহিনীর মুখপাত্র কমান্ডার অ্যামেলিয়া উমায়াম জানিয়েছেন, বর্তমান ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে মার্কিন সামরিক ইউনিটগুলো বাস্তব মিশনে ব্যস্ত থাকায় এই বছর বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে এয়ার শো এমনিতেই বাতিল করা হয়েছে। আইডাহোর এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে মার্কিন নৌবাহিনী একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ সামরিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। যেহেতু চারজন ক্রুই জীবিত আছেন, তাই তাদের ব্ল্যাক বক্সের ডেটা, যোগাযোগ রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষ জবানবন্দি বিশ্লেষণের মাধ্যমে খুব দ্রুতই এই দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








