ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হরমুজ প্রণালিতে ডুবল দুই জাহাজ
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি ও এর পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ডুবে গেছে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ। এর মধ্যে একটি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ জিএফএস প্রাইড এবং অন্যটি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী শুকনা পণ্যবাহী জাহাজ কেপ দাও। পৃথক হামলায় জাহাজ দুটি ডুবে যাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে বুধবার (১৪ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি (এমপিএ) জানায়, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় জিএফএস প্রাইড জাহাজটি নিক্ষিপ্ত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং পরে সেটি ডুবে যায়। জাহাজটিতে ২১ জন নাবিক ছিলেন। তাঁদের সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় কেউ আহত হননি। ২ হাজার ৮২৪ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জিএফএস শিপ ম্যানেজমেন্ট এফজেডই। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, কেপ দাও জাহাজটি গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রজেক্টাইল বা নিক্ষিপ্ত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হামলার পরপরই জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া হলেও একজন নাবিক নিহত হন। পরবর্তী সময়ে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ডুবে যায়। জাহাজটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক পিওনিজ শিপ ম্যানেজমেন্ট এফজেডই-এর সঙ্গেও তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আইএমওর জাহাজ দুর্ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালির আশপাশে ডুবে যাওয়া জাহাজের তালিকায় জিএফএস প্রাইড দ্বিতীয় এবং কেপ দাও তৃতীয়। এর আগে মার্চে নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রণালির উত্তরে মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ সাফিন প্রেস্টিজ ডুবে যায়। এ ছাড়া এপ্রিলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এমএসসি ফ্রান্সেসকা নামের একটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটি জব্দ করে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, সংঘাতের প্রভাব এখন আর শুধু তেলবাহী ট্যাংকারে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
আরও পড়ুন: সাত শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলবে না: ইরান
হরমুজ প্রণালিতে গত ১০ দিনে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। সিঙ্গাপুরের এমপিএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সংস্থাটির ভাষ্য, এ ধরনের উসকানিবিহীন হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মারিস্কসও সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি এখনো অত্যন্ত গুরুতর। ঝুঁকি কেবল তেলবাহী ট্যাংকারে সীমাবদ্ধ না থেকে কনটেইনারবাহী ও শুকনা পণ্য পরিবহনকারী জাহাজেও ছড়িয়ে পড়েছে।
সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চাইছে ইরান। দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং গত মাসে আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে হামলা জোরদারের কথা জানিয়েছে তেহরান। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, প্রণালিটি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করছে দেশটি। বিশ্ববাজারে তেলের দাম উঁচুতে রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারও এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাইয়ের বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু আঞ্চলিক নৌপরিবহন নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, পণ্য পরিবহনের ব্যয় এবং বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের মধ্যে ধারাবাহিক হামলা এবং পাল্টাপাল্টি বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দুটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার সর্বশেষ ঘটনা হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। নাবিকদের জীবন রক্ষা, আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন এড়াতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি হয়ে উঠেছে। সংঘাত অব্যাহত থাকলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








