আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৩৭, ১২ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি-হুতি সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব ইরানের

সৌদি-হুতি সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব ইরানের

ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি আরবের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ স্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংঘাতের তীব্রতা কমানো ও নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার পথ তৈরির লক্ষ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।

সৌদি আরবের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ১০ অক্টোবর হুতিদের চালানো এক ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩ শতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর টার্মিনাল-৪ সংলগ্ন অঞ্চলে আবারও হামলা চালানো হলে পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত রূপ নেয় এবং রিয়াদগামী ও রিয়াদ ছাড়ার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত সহস্রাধিক ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটির সার্বিক কার্যক্রম স্থগিত করে। এই নজিরবিহীন ঘটনার জবাবে হুতিদের সামরিক ও কৌশলগত অঞ্চলগুলোতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিমান হামলা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় দাম্মাম বিমানবন্দরেও পৃথক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গোটা বিশ্বের দৃষ্টি এখন এই অঞ্চলের দিকে।

এই সংকটজনক পরিস্থিতে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংলাপ শুরুর রাজনৈতিক পথ তৈরিতে মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। 

রবিবার (১১ অক্টোবর) রাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সাথে টেলিফোনে সংকট পর্যালোচনা ও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। 

ফোনালাপে আরাঘচি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক পদক্ষেপের ওপর অতিনির্ভরশীলতা ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ উপেক্ষা করার দিকে ইঙ্গিত করে সতর্ক করে বলেন, এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। সামরিক পন্থা বেছে নিলে এই জটিল পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পৌঁছাবে। 

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় যেকোনো সংলাপের আয়োজনে তেহরানের সরাসরি সার্বিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেন আরাঘচি। 

আরও পড়ুন: সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারে হুতিদের হুঁশিয়ারি

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাও আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সৌদি আরবের গৃহীত সিদ্ধান্ত বা অবস্থানের কথা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।

এদিকে সোমবার (১২ অক্টোবর) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, দুটি প্রতিবেশী মুসলিম দেশের মধ্যে যুদ্ধ ও বৈরিতা বজায় থাকুক তা তেহরান চায় না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সৃষ্ট সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয় বন্ধ করার জন্য আলোচনায় অংশ নিতে উভয়পক্ষকে আহ্বান জানান তিনি। তবে ইয়েমেনিদের ওপর বছরের পর বছর ধরে চলা অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের মর্যাদার সাথে বাঁচার সুযোগ দেওয়ার ওপরও জোর দেন এই মুখপাত্র।

রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মধ্যস্থতার এই প্রস্তাব একদিকে যেমন তেহরানের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব জাহির করে, অন্যদিকে হুতিদের হামলার পেছনে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নীতিগত ও কৌশলগত সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে। 

সামরিক প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক বিশ্লেষক আলেকজান্দ্রু হুদিসতেনু আল জাজিরা-কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, তেহরানের পক্ষ থেকে সৌদি-হুতি সমঝোতার এ মধ্যস্থতা ইঙ্গিত করে যে সৌদি আরবে হুতিদের সামরিক অভিযান ইরানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশের বাইরে নয়। আঞ্চলিক ক্ষমতার একটি অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিজেকে ধরে রাখতেই ইরান নিজের প্রক্সি এবং প্রভাবকে কূটনীতির হাতিয়ার বানাতে চাচ্ছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়িন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট-এর নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসির মতামত অনুযায়ী, যদিও জ্বালানি বাজারে হুতিদের সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় তেহরানের কিছু পরোক্ষ সুবিধা হতে পারে, তবে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে ইরান নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা না হলে হুতিদের অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর মতো প্রভাব তেহরানের হাতে কতটা রয়েছে, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও হুতিদের কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমেরিকান প্রশাসন বা পরবর্তী নীতি সৌদি আরবের সামরিক প্রতিরোধ জোরালো করতে কীভাবে ভূমিকা রাখে তার ওপরও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন জোগালেও বর্তমানে সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে কৌশলগত স্থানে আঘাত আসতে শুরু করায় রিয়াদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা বিধান করা। বর্তমান উত্তপ্ত আবহাওয়ায় হুতিদের সাথে সরাসরি টেবিল বৈঠকে বসা বা ইরানের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংলাপে যাওয়া সহজ হবে না। এটি নির্ভর করবে প্রধানত উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরগুলোতে হুতিদের আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হওয়া এবং হুতিদের পক্ষ থেকে বিমান অবরোধ শিথিল করার দীর্ঘদিনের শর্ত পূরণসহ পারস্পরিক নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বিধানের ওপর।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়