সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারে হুতিদের হুঁশিয়ারি
ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। জাহাজীকরণ প্রতিষ্ঠান, এয়ারলাইনস, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সৌদি আরবে কাজ করতে যেতে ইচ্ছুক কর্মী এবং পর্যটকদের উদ্দেশে দেওয়া এ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সৌদি আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহারকারীরা হুতিদের সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।
এরই মধ্যে হুতিদের হুমকি ও হামলার জেরে সৌদি আরবে বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বাতিল হচ্ছে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট, আর আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোও দেশটিতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্কতা জোরদার করছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে হুতিদের নতুন হুঁশিয়ারির বিষয়টি উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, সৌদি আরবের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্টরা তাদের বাহিনীর সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবেন। এর আগে রিয়াদ ছাড়া সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দরেও হামলার হুমকি দিয়েছিল হুতিরা। এবার সেই হুমকির পরিধি আরও বিস্তৃত করে দেশটির আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সরাসরি সতর্কবার্তা দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া সারির দাবি, গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে হুতি যোদ্ধারা। এসব অভিযানের কারণে বিমানবন্দরটির ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
গতকাল রবিবার টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যেও শনিবারের হামলার দায় স্বীকার করেন হুতিদের এই সামরিক মুখপাত্র। একই সঙ্গে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মাম বিমানবন্দর এবং দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবিও করেন তিনি।
অন্যদিকে, হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন টেলিভিশন চ্যানেল আল মাসিরাহ জানিয়েছে, ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকির মধ্যে সৌদি আরব এবং ইয়েমেনকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
এর আগে গতকাল রোববার ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমাকে সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করে একই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
সে সময় তিনি বলেছিলেন, বিমানবন্দর ও আকাশসীমা হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এগুলো তাদের বাহিনীর সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু। তবে পবিত্র মক্কা ও মদিনা শহরকে এই হুমকির আওতামুক্ত রাখার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই শহর ছাড়া সৌদি আরবের অন্যান্য শহরে যাতায়াত না করার জন্য যাত্রীদের সতর্ক করেছিল হুতিরা। এবার সেই সতর্কবার্তা আরও বিস্তৃত করে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার না করার বিষয়ে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবের বিমানবন্দরে আবারও হামলা
হুতিদের হুমকির প্রভাব সৌদি আরবের বিমান চলাচলে ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার রিয়াদের আকাশে উড়োজাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এদিন সৌদি আরবের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক শহর জেদ্দার পর দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গতকাল রবিবার নির্ধারিত ফ্লাইটের ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ বাতিল করা হয়।
সোমবার দেশজুড়ে নির্ধারিত ফ্লাইটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি চলাচল বন্ধ থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।
ফ্লাইট চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর হিসাবেও রিয়াদ বিমানবন্দরে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিলের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরটিতে প্রায় ৭৮ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গতকাল রোববারের হামলায় একজন নিহত এবং অন্তত ১২ জন আহত হওয়ার পর সৌদি রাজধানীর বিমানবন্দরটি বন্ধ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগের দিন হুতিদের দাবি করা আরেকটি হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। ধারাবাহিক এসব হামলায় সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচলব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে।
পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনেও। হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস সৌদি আরবগামী এবং দেশটি থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইট স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) গতকাল রবিবার দেশটির এয়ারলাইনসগুলোকে সৌদি আরবে যাতায়াতের সময় এবং দেশটির আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
অন্যদিকে, এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম সৌদি রাজধানী রিয়াদে যাওয়া-আসার ফ্লাইট স্থগিত রাখার আগের সিদ্ধান্তের মেয়াদ বাড়িয়ে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।
হুতিদের ধারাবাহিক হামলার দাবি, বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন করে দেওয়া আকাশসীমা ব্যবহারের হুঁশিয়ারির ফলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পরিস্থিতির কারণে যাত্রী, পর্যটক, কর্মী এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর জন্য সৌদি আরবের আকাশপথ ব্যবহার ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








