ডেঙ্গুতে আরও ৪ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ২১৬৭
ফাইল ছবি
সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে নতুন রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা। পরিস্থিতি সামলাতে হাসপাতালগুলোতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
অন্যদিকে কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর ধরন বা মিউটেশন পরিবর্তনের কারণে এবার রোগীরা দ্রুত জটিল অবস্থায় চলে যাচ্ছেন, যা মৃত্যুর হার বাড়াতে অন্যতম ভূমিকা রাখছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া সর্বশেষ ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের প্রত্যেকেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার বাসিন্দা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এর আগের দিন রবিবারও সারাদেশে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
গত একদিনে ডেঙ্গু জরে আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৬৭ জন রোগী। যদিও এটি তার আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কম গতকাল একদিনে রেকর্ড সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৯৩ জন ভর্তি হয়েছিলেন।
অধিদপ্তরের উপাত্ত অনুযায়ী, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে সর্বোচ্চ ৫৩০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ২৫০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ২৫০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক বিভাগগুলোর মধ্যে খুলনা বিভাগে ৩০৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৯৩ জন, বরিশাল বিভাগে ২৩৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৬০ জন, রংপুর বিভাগে ৮৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭০ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০৭ জনে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৪৪২ জনে। এ পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু তালিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৩ জন মারা গেছেন খুলনা বিভাগে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছুঁইছুঁই ৩০০, আক্রান্ত ১৬৩১
মেডিকেল ও কীটপতঙ্গ বিশেষজ্ঞদের মতে, আগস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বর এবং সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার জানান, ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ঘাটতির কারণে অক্টোবরজুড়েই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি থাকছে। পরিস্থিতি আগামী মাস অর্থাৎ নভেম্বর পর্যন্ত একইভাবে অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ঘরবাড়ি ঝাড়ু দেওয়া বা লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতা দিয়ে ফল আসবে না। বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে প্রাপ্তবয়স্ক মশা ও লার্ভা ধ্বংসে পরিকল্পিত কর্মসূচির সুফল পেতে ২-৩ বছর সময় লাগতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর হার কমানোর জন্য প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতালেও এনএস-১ (NS1) কিট দিয়ে জ্বর আক্রান্তদের দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রোগীরা ১ থেকে ২ দিনের মধ্যেই শকে (Dengue Shock Syndrome) চলে যাচ্ছেন। রক্তে প্লাজমা লিকেজ ও অনুচক্রিকা (প্লাটলেট) কমার পাশাপাশি অনেকের হার্ট অ্যাটাক ও অর্গান ফেইলিওর হচ্ছে। একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী ও ক্রনিক রোগীর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত দ্রুত সংকটজনক হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা তীব্র জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজ থেকে ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল ব্যতীত যেকোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার ব্যর্থ কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় জাতীয় গাইডলাইন ও প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক মশা ধ্বংসে ফগিং এবং লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইড স্প্রে অব্যাহত আছে। ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশে ছাদের টব বা অন্যাত্র জমে থাকা পরিষ্কার পানি থেকে যেন এডিস জন্ম না নেয়, সেজন্য প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করার পাশাপাশি জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








