খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা, কনটেইনারে অবরুদ্ধ পেশোয়ার
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ দশক ধরে সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেলেও পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ার তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল। তবে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পরিচালিত প্রাদেশিক সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মুখোমুখি অবস্থান, পিটিআইয়ের লংমার্চ এবং সর্বশেষ খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির ফলে সমগ্র পেশোয়ারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এক নাটকীয় ও কঠোর পরিবর্তন এসেছে।
কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তি এবং বিভিন্ন দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে গত ৪ অক্টোবর থেকে পিটিআইয়ের লংমার্চ শুরু হয়। এই লংমার্চের গন্তব্য রাজধানী ইসলামাবাদ হলেও উদ্ভূত রাজনৈতিক অচলবস্থা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকারের সুপারিশে এবং প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির অনুমোদনক্রমে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করা হয়।
সংবিধানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দুটি বিশেষ অনুচ্ছেদ এর আওতায় এই ঘোষণা আসায় পিটিআই পরিচালিত প্রাদেশিক সরকারের সমস্ত কার্যকারিতা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কার্যত স্থগিত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রদেশে আইনৃঙ্খলা রক্ষা ও সরকারি স্থাপনার সুরক্ষায় সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের অধীনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
জরুরি অবস্থা জারির আগের রাতে পেশোয়ারে প্রবল বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতা হলেও পরদিন সকালটি ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। তবে রোববারের সেই সকাল থেকেই শহরজুড়ে একধরনের চাপা আতঙ্ক ও থমথমে ভাব বিরাজ করছিল। সাধারণ মানুষ ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোনে কোনো সিগন্যাল বা নেটওয়ার্ক না পেয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে পড়েন।
আরও পড়ুন: দিল্লিতে রেড অ্যালার্ট জারি
এর আগে পিটিআইয়ের লংমার্চের কারণে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল, যা জরুরি অবস্থা জারির পর বিকেলে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও স্বাভাবিক চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়। এছাড়া গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রীরা তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন।
পেশোয়ারের প্রাণকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো এখন নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শহরের প্রধান প্রবেশপথ ও পয়েন্টগুলোতে শিপিং কনটেইনার বসিয়ে এবং ব্যারিকেড দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফিরদৌস চকে কন্টেইনার বসিয়ে ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং মালিক সাদ শহিদ চক থেকে ফিরদৌস চক পর্যন্ত বন্ধ দোকানপাটের সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। ফ্রন্টিয়ার কোরস নর্থের সদর দপ্তর সংলগ্ন বালা হিসার দুর্গের ফটকও বন্ধ রাখা হয়েছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রাদেশিক পরিষদের নিকটবর্তী সুরি চকে খাইবার রোডের প্রবেশপথ কনটেইনার দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে এবং রেড জোন এলাকার দিকে যাওয়ার সড়কগুলোতে কড়া পাহারা বসানো হয়েছে। সাহিবজাদা আবদুল কাইয়ুম রোডে অবস্থিত গভর্নরের বাসভবনে যাতায়াতকারীদের কঠোর তল্লাশির মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে নিয়মিত টহল দিচ্ছে সাঁজোয়া যান ও দাঙ্গা পুলিশ। এছাড়া খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র সিভিল সেক্রেটারিয়েট পুরোপুরি জনশূন্য অবস্থায় রয়েছে।
অতীতে পেশোয়ার থেকে ইসলামাবাদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল যাওয়ার কারণে সাধারণত রাজধানী ইসলামাবাদকেই কনটেইনার দিয়ে দুর্গের মতো অবরুদ্ধ করে রাখতে হতো। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে গেছে এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার রাজধানী পেশোয়ারেই কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে একই ধরনের নজিরবিহীন নিরাপত্তাবেষ্টনী ও কন্টেইনার বসানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় সরকার এবং পিটিআইয়ের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নতুন রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রদেশের সামগ্রিক রাজনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আপাতত কঠোর নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্ল্যাকআউটের বেড়াজালে পেশোয়ারের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে রয়েছে এবং এই বিধিনিষেধ কত দিন বহাল থাকবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








