প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২%, মূল্যস্ফীতি ১০.৯%, আইএমএফের সতর্কবার্তা
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে আরও বড় বাধার ইঙ্গিত দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির গতি দুর্বল থাকার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও উচ্চ পর্যায়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কমানো এবং মূল্যস্ফীতির হিসাব বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের চলমান বার্ষিক সভার মধ্যে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
এর আগে গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল আইএমএফ; জুলাইয়ে সেই পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। এবার তা আরও কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামানো হয়েছে।
অন্যদিকে, এপ্রিলের পূর্বাভাসে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে সীমিত থাকার কথা বলা হলেও নতুন হিসাবে তা প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির দুই সূচকেই পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা সামনে এসেছে।
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বা চূড়ান্ত হিসাবে হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ; একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়াতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে। এর অর্থ, আগের অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। যদিও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমার অর্থ এই নয় যে দেশের মোট উৎপাদন সরাসরি সংকুচিত হচ্ছে, তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আয় বৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল থাকার ইঙ্গিত এতে স্পষ্ট। বিশেষত কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসও আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বব্যাংক অক্টোবরের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ উভয় অর্থবছরের জন্য ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জন্য ৪ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাগুলোর হিসাবের সময়কাল ও পূর্বাভাসের পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকায় এগুলোকে সরাসরি একই ভিত্তিতে তুলনা করা ঠিক নয়। তবে সামগ্রিকভাবে দুর্বল বিনিয়োগ, শিল্পের সরবরাহগত সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে চাপে রাখছে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে মিল রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস ও অন্যান্য সংস্থার হিসাব।
মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি পরিসংখ্যানে বর্তমানে যে মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছে, আইএমএফের পুরো অর্থবছরভিত্তিক গড় পূর্বাভাস তার চেয়ে অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে নয়, বরং ৭ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে; বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামীণ পরিবারগুলো সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির বেশি চাপের মুখে ছিল।
আরও উদ্বেগের বিষয়, সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার নেমে আসে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল। এ ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মজীবী মানুষের আয় বাড়লেও সেই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হতে পারে। বিবিএসের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে আইএমএফের পূর্বাভাসের পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, একটি হলো নির্দিষ্ট মাসের বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির হার, অন্যটি পুরো অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য হিসাব। তাই ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ থেকে সরাসরি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা যাবে না; বরং সামনের মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আইএমএফের পূর্বাভাসটি সতর্ক করছে। বিবিএসের সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্য।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটও গুরুত্বপূর্ণ। মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। জ্বালানি খাতের গভীরতর সমস্যা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, দেশীয় রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিনিয়োগ কার্যক্রম দুর্বল হয়েছে, রপ্তানির গতি হারিয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়েছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে; সীমিত রাজস্বের কারণে সরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও বাধা তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক খাতে দ্রুত সংস্কার, দেশীয় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
সংস্থাটির পূর্বাভাসে, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সংস্কার কর্মসূচির গতি বাড়ানো গেলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি ঘটাতে হবে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য অন্যতম বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এমন উচ্চ হার ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা, আমানতকারীদের আস্থা এবং নতুন বিনিয়োগে অর্থায়নের পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ব্যাংকের বড় অংশের সম্পদ অনাদায়ী ঋণে আটকে থাকলে উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে; একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের দুর্বলতা আর্থিক খাতের ঝুঁকি বাড়ায়। এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; ঋণের মান যাচাই, খেলাপি ঋণ আদায়, প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ, ব্যাংকের পরিচালনায় জবাবদিহি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ব্যাংক খাতের সংকটের প্রভাব শিল্প, ব্যবসা ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
রাজস্ব আহরণে দুর্বলতাও অর্থনীতির নীতিগত সক্ষমতাকে সীমিত করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহ জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল, যা আন্তর্জাতিক তুলনায় অত্যন্ত কম। একই সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ বেড়েছে; অর্থবছরটিতে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। রাজস্বের ভিত্তি সংকীর্ণ হলে সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে কঠিন সমন্বয় করতে হয়। আবার ঘাটতি অর্থায়নের পদ্ধতি, ঋণের ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর ফাঁকি ও অবৈধ সুবিধা কমানো, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি। তবে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ এমনভাবে নিতে হবে, যাতে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অযৌক্তিক বোঝা না পড়ে এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত না হয়।
আরও পড়ুন: বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার পেতে আলোচনা চলছে
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হতে পারে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থমকে গেছে এবং নারীরা চাকরি হারিয়েছেন। অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ কমে গেলে শ্রমবাজারে নতুন কর্মীর প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়; বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে নিয়োগ স্থগিত, কর্মঘণ্টা কমানো কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব তরুণ, নতুন চাকরিপ্রার্থী, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিক এবং নারীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে প্রকৃত মজুরি না বাড়লে পরিবারগুলো খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যয় সামলাতে সঞ্চয় কমানো বা প্রয়োজনীয় ভোগ সীমিত করার পথে যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পুষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার ওপরও পড়তে পারে। তাই প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর নীতিকে কেবল মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাস্তব মজুরি বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয় বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতি দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি থাকলে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে খরচ বাড়ে এবং সরবরাহের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর ফলে উৎপাদিত পণ্যের একক ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন বা তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং সরকারের জ্বালানি ভর্তুকির প্রয়োজন বাড়তে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে বিনিময় হার, আমদানি ব্যবস্থাপনা, দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা, বাজার প্রতিযোগিতা এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের ওপর। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সরকারের ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বাবদ বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও সুবিধার উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্রতম পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছায় না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরিদ্রতম পরিবারের প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। ফলে যাদের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারও কিছু কর্মসূচির সুবিধা পেতে পারে। এ ধরনের দুর্বল লক্ষ্যনির্ধারণ সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা কমায় এবং সীমিত রাজস্বের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্বব্যাংক সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি সমন্বয় এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে উন্নত লক্ষ্যনির্ধারণ যুক্ত করার মাধ্যমে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করা সম্ভব বলে সংস্থাটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বা গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা দরিদ্র পরিবারের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন, নির্ভরযোগ্য উপকারভোগী তালিকা এবং সময়মতো নগদ বা খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা ও অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংস্থা দুটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
আইএমএফের কর্মকর্তা উরজিত প্যাটেল এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিয়ার্দের সঙ্গে আলোচনায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কর্মসূচি ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ ধরনের অর্থায়নের সম্ভাবনা চূড়ান্ত ঋণ বা অনুদান অনুমোদনের সমতুল্য নয়; অর্থের পরিমাণ, শর্ত, সময়সীমা ও ব্যবহার সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রয়োজন। উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলানো, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সুশাসন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। আইএমএফের অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর পর ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
সংস্থাটির মূল্যায়নে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে; এর প্রভাব উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়ছে।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ কিছু অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে সহায়তা করছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ২ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। চীনের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির এই গড় চিত্র সব দেশের জন্য সমান সুযোগ নির্দেশ করে না। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং আর্থিক ও রাজস্ব সক্ষমতা সীমিত দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সামাল দিতে তুলনামূলক বেশি সমস্যায় পড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জ্বালানি আমদানি ব্যয়, রপ্তানি চাহিদা, রেমিট্যান্স, বিনিময় হার এবং বৈদেশিক অর্থায়নের পরিবেশ অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ফলাফল হিসেবে না দেখে বর্তমান ঝুঁকির একটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশীয় নীতি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের অগ্রগতির ওপর। তবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ধারাবাহিকভাবে কমে আসা এবং মূল্যস্ফীতির হিসাব বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের সামনে স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধনসংক্রান্ত দুর্বলতা মোকাবিলা, কর-রাজস্ব বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করা এবং কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কমানো এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার তখনই সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব সুফল বয়ে আনবে, যখন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়বে এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপে মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও অবনতি হবে না।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








