নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৪১, ১১ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ১৯:৪৩, ১১ অক্টোবর ২০২৬

দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে পতিতালয়ের মাটি কেন ব্যবহার করা হয়?

দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে পতিতালয়ের মাটি কেন ব্যবহার করা হয়?

ছবি: সংগৃহীত

শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, আলোর সাজ আর মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি বছর চার দিনের পূজায় দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসেন। তাকে ঘিরেই শুরু হয় উৎসব। তবে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রচলিত রীতি বহু মানুষের কৌতূহল জাগায়। সেটি হলো, প্রতিমা তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটির পাশাপাশি যৌনপল্লির মাটিও ব্যবহার করা।

যে সমাজের একটি অংশ যৌনকর্মীদের অবহেলা ও বৈষম্যের চোখে দেখে, সেই সমাজের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসবের প্রতিমা তৈরিতে তাদের বসতির মাটি কেন ব্যবহৃত হয়? এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা। তবে এই প্রথার উৎস ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রচলিত সব কাহিনির পক্ষে সমানভাবে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

কী এই পুণ্যমাটি?
বাংলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রচলিত রীতিটি কোথাও পুণ্যমাটি, আবার কোথাও নিষিদ্ধপল্লির মাটি নামে পরিচিত।

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটির সঙ্গে সাধারণ মাটি এবং কয়েকটি বিশেষ উপাদান মেশানো হয়। কিছু ধর্মীয় ও লোকাচারভিত্তিক বর্ণনায় গোবর, গোমূত্র এবং যৌনপল্লির মাটির কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব উপাদানের ব্যবহার অঞ্চল ও প্রতিমা তৈরির রীতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

কিছু বর্ণনায় নর্তকী, কাপালিনী, গোয়ালিনী, মালিনী, পতিতা, ধোপানি, নাপিতনি, ব্রাহ্মণী ও শূদ্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত মাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এই তালিকা সর্বজনস্বীকৃত বা সর্বত্র অনুসৃত এমনটি বলা যায় না।

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী যৌনপল্লিতে গিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে মাটি চান। লোকাচারের কিছু বর্ণনায় মাটি দানের ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের সম্মতি ও সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোথাও এই মাটি প্রতিমার মূল উপকরণের সঙ্গে মেশানো হয়, আবার কোথাও রীতিটি প্রতীকীভাবে পালন করা হয়।

কেন যৌনপল্লির মাটিকে পুণ্যমাটি বলা হয়?
এ বিষয়ে একটি বহুল প্রচলিত লোকবিশ্বাস রয়েছে। বলা হয়, পুরুষেরা যৌনপল্লিতে গিয়ে নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে আসে এবং পাপ নিয়ে ফিরে যায়। সেই বিশ্বাস থেকেই যৌনপল্লির মাটিকে পুণ্যময় বলে বিবেচনা করার ধারণার প্রচলন হয়েছে।

তবে এই ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য বা সর্বজনস্বীকৃত ধর্মীয় বিধান হিসেবে দেখার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ স্পষ্ট নয়। এটি মূলত প্রচলিত লোককথা ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার অংশ।

সমাজের চোখে যারা ব্রাত্য, দেবীর কাছে কি তারাও সমান?
যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের সবচেয়ে আলোচিত ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। সমাজের একটি অংশ যখন যৌনকর্মীদের অবজ্ঞা করে বা তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে, তখন তাঁদের বসতির মাটি দুর্গাপ্রতিমায় ব্যবহারের রীতিকে অনেকে প্রতীকী তাৎপর্যে দেখেন।

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমাজ যাদের প্রান্তে ঠেলে দেয়, তারাও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেবী দুর্গাকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়। সেই মাতৃভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে অনেকে মনে করেন, দেবীর আরাধনায় মানুষের মধ্যে সামাজিক মর্যাদা বা পেশার ভিত্তিতে ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে যৌনপল্লির মাটি গ্রহণের রীতি শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি যৌনকর্মীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, মর্যাদা ও বৈষম্য নিয়েও ভাবার একটি উপলক্ষ।

তবে এ প্রথার অর্থ নিয়ে বিভিন্ন মানুষের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাই সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ব্যাখ্যাটিকে একমাত্র বা চূড়ান্ত ধর্মীয় ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা না করে লোকাচার, বিশ্বাস ও সামাজিক চিন্তার একটি প্রকাশ হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত।

কীভাবে সংগ্রহ করা হয় এই মাটি?
প্রচলিত বর্ণনায়, দুর্গাপ্রতিমা তৈরির জন্য যৌনপল্লি থেকে মাটি সংগ্রহের একটি বিশেষ রীতির কথা বলা হয়। কোথাও পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পীর উদ্যোগে এই মাটি সংগ্রহ করা হয়। মাটি চাওয়া, তা গ্রহণ করা এবং প্রতিমা তৈরির উপকরণের সঙ্গে মেশানোর মধ্যে ধর্মীয় আচারের গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

লোকাচারের কিছু বর্ণনায় মাটি দানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের সম্মতি ও সদিচ্ছাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে সব অঞ্চলে বা সব প্রতিমাশিল্পীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করা হয় না।

শিবকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা
যৌনপল্লির মাটি দুর্গাপ্রতিমায় ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে একটি জনপ্রিয় লোককথা প্রচলিত রয়েছে। কাহিনি অনুযায়ী, একবার কয়েকজন যৌনকর্মী গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার পথে নদীর তীরে এক কুষ্ঠরোগীকে দেখতে পান। ওই ব্যক্তি অন্যদের কাছে গঙ্গাস্নানে সাহায্য চাইলেও কেউ এগিয়ে আসছিলেন না।

তখন ওই নারীরা তাকে সাহায্য করে গঙ্গাস্নান করান। লোককথা অনুযায়ী, ওই কুষ্ঠরোগী ছিলেন স্বয়ং দেবতা শিব। নারীদের সহমর্মিতায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করেন এবং তাদের বর চাইতে বলেন।

তখন ওই নারীরা চান, তাদের উঠোনের মাটি দিয়ে যেন দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়। শিব তাদের সেই বর দেন। এই কাহিনি অনুসারেই গঙ্গার তীরের মাটির পাশাপাশি যৌনপল্লির আঙিনার মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির প্রথা শুরু হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।

তবে এটি একটি প্রচলিত লোককথা। এর ঐতিহাসিক সত্যতা বা নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় না।

দেবী পুরাণকে ঘিরে আরেকটি কাহিনি
দেবী পুরাণের উল্লেখ করে প্রচলিত আরেকটি কাহিনিতে বলা হয়, এক কিশোরী যৌনকর্মীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করেন এবং তার পূজায় ওই কিশোরীর আঙিনার মাটি প্রয়োজন হবে বলে জানান।

আরও পড়ুন: স্মার্ট নারীর ব্যাগে যা যা থাকা জরুরি

এই কাহিনির ব্যাখ্যায় বলা হয়, সমাজ যাদের দূরে সরিয়ে রাখে, দেবী তাদেরও আপন করে নেন। তবে এই কাহিনির নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় সূত্র ও প্রামাণিকতা যাচাই করা জরুরি। প্রচলিত কাহিনি হিসেবে এর উল্লেখ থাকলেও একে সরাসরি প্রমাণিত ধর্মীয় বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

সব মিলিয়ে, দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের রীতিকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা ও সামাজিক ব্যাখ্যা একে অপরের সঙ্গে মিশে রয়েছে। এর সুনির্দিষ্ট উৎস নিয়ে মতভেদ থাকলেও রীতিটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। সূত্র: নিউজ১৮, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়