নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৩৩, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ১৫:৩৮, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা: রাষ্ট্রপতি

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা: রাষ্ট্রপতি

ছবি: সংগৃহীত

দুর্যোগপরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেয়ে দুর্যোগ আসার আগেই ঝুঁকি কমিয়ে এনে একটি সহনশীল সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা হতে হবে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। একই সঙ্গে প্রতিটি ঘর ও পরিবারকে প্রস্তুত করার মাধ্যমেই টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এ বছর দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলম।

দুর্যোগপরবর্তী বিপর্যয় কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে আগাম সচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রতিটি ঘরকেই দুর্যোগ মোকাবিলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। দুর্যোগের প্রথম আঘাত যেহেতু পরিবার ও বাসাবাড়ির ওপর আসে, তাই দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ব্যক্তি ও পারিবারিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজেদের ঘরবাড়ি নিরাপদ করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের দুর্যোগ প্রস্তুতির আওতায় আনতে হবে। জরুরি কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদে রাখা এবং সরকারের আগাম সতর্কবার্তায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। 

তিনি আরও যোগ করেন, সহনশীলতার সূচনা হোক নিজের ঘর থেকেই। নিজের ঘরকে নিরাপদ করুন, পরিবারকে প্রস্তুত রাখুন এবং রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলুন।

দেশের দুর্যোগ ঝুঁকির চিত্রে ভূমিকম্পকে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক উদীয়মান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেন রাষ্ট্রপতি।

আরও পড়ুন: কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন নগরাঞ্চলের তীব্র ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগও রয়েছে, যা নিয়ে আমরা খুব কম চিন্তা করি। ঢাকা শহরের দিকে তাকালে আজ যে আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি হয়, তা হলো একটি তীব্র ভূমিকম্প হলে শহরটি একেবারেই মিশে যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা না থাকার কারণে আমরা দেখেছি প্রাণহানির সংখ্যা কতটা ভয়াবহ হয়।

নগরে ভবন নির্মাণবিধির (বিল্ডিং কোড) প্রয়োগে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। তাই আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মকানুন ও মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলার তাগিদ দেন তিনি।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব।জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে বাংলাদেশের ভূমিকা একেবারেই নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও এ দেশের মানুষকেই এর সবচেয়ে বড় শিকার হতে হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। 

বৈশ্বিক ঝুঁকির বিশ্লেষণে তিনি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ুজনিত সংকটের কারণে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হতে পারে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের এক বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী হিমবাহধসের উদাহরণ টেনে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিভাবে কোনো দেশের অর্থনীতি, জীবন ও জীবিকাকে মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দিতে পারে নেপালের ঘটনা তার বড় প্রমাণ।

সম্মুখসারির স্বেচ্ছাসেবকদের সুরক্ষা আইন ও সমতা নিশ্চিতকরণদুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অতীত সক্ষমতা ও অর্জনের প্রশংসা করলেও উন্নয়নের বেশ কিছু ক্ষেত্র এখনো বাকি রয়েছে বলে মত দেন প্রধান অতিথি। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রাণপণ লড়াই করা সম্মুখসারির যোদ্ধা স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো না থাকায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। এ কারণে জরুরি ভিত্তিতে স্বেচ্ছাসেবকদের আইনি অধিকার, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি। 

একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলার সমন্বিত কৌশল ও পরিকল্পনায় সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল গোষ্ঠী অর্থাৎ নারী, শিশু, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও চাহিদাকে পরিকল্পনার একদম কেন্দ্রে রাখার নির্দেশ দেন তিনি।  

জনগণের অংশগ্রহণকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করে রাষ্ট্রপতি নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা এবং ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ অভিযানের তাগিদ দেন।

পরিবেশ রক্ষায় চলমান উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সারাদেশে প্রায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের একটি বৃহৎ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগ আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় তা উল্লেখযোগ্য ও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়