ঢাবিতে শিক্ষকের ছেলের প্রাইভেটকারের ধাক্কায় আহত ৫ শিক্ষার্থী
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে এক শিক্ষকের ছেলের বেপরোয়া ও লাইসেন্সবিহীন প্রাইভেটকারের ধাক্কায় অন্তত পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের (৩২তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি ভাঙচুর করেন এবং গাড়িতে থাকা দুজনকে গণধোলাই দেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং চালককে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে আটক রাখা হয়।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ (এফবিএস) ও মলচত্বর সংলগ্ন প্রবেশদ্বারের সামনের সড়কে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেটকারটি ঢাবির গণিত বিভাগের শিক্ষক ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলামের। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন তার ছেলে সাদমান সাকিব। সাদমান নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি)-এর ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী। চালকের আসনে থাকলেও তার কোনো বৈধ্য ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। প্রথমবারের মতো গাড়ি চালানো শিখতে বাবার গাড়িটি নিয়ে তিনি বেপরোয়া গতিতে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করছিলেন। একপর্যায়ে এফবিএস ও মলচত্বর সংলগ্ন গেটের সামনে এলে দ্রুতগতির গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এ সময় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ও রিকশায় চেপে পথ অতিক্রম করা একদল শিক্ষার্থীকে গাড়িটি সরাসরি সজোরে ধাক্কা দেয়। প্রাইভেটকারের তীব্র ধাক্কায় রিকশায় থাকা শিক্ষার্থীরা ছিটকে রাস্তায় পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকট শব্দের পর দেখা যায় কয়েকজন শিক্ষার্থী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। আঘাতের তীব্রতায় দুজনের পা কেটে আশঙ্কাজনকভাবে রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং অন্যরা শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পান।
দুর্ঘটনায় আহত চিহ্নিত শিক্ষার্থীরা হলেন জাহিদুল ইসলাম হৃদয়, কানিজ ফাতেমা, তাসনিয়া বেগম, মিফতাহুল, তাসফিয়া তাবাসসুম এবং সিদরাতুল। তারা সবাই মার্কেটিং বিভাগের ৩২তম ব্যাচের সহপাঠী।
আরও পড়ুন: চুয়েটে ২১ ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ উপাচার্য
প্রত্যক্ষদর্শী ও একই বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম রহমান জানান, বিকট শব্দ শুনে রাস্তায় ছুটে গিয়ে তারা দেখেন গাড়িটি সরাসরি রিকশায় এসে আছড়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। পরিস্থিতি দেখে আশপাশের শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যান।
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদ ইমতিয়াজ বলেন, শিক্ষকের ছেলে অনভিজ্ঞ অবস্থায় লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে গিয়ে আমাদের বিভাগের অন্তত ছয়জন শিক্ষার্থীকে গাড়িচাপা দিয়েছেন। আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা সবাই ঢামেকে চিকিৎসাধীন। আমরা অভিযুক্তকে দ্রততম সময়ে যথাযথ আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে বেপরোয়া গাড়ি চালনার জেরে দুর্ঘটনার পরপরই ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেটকারটি ঘিরে ফেলেন এবং গাড়িটিতে ভাঙচুর চালান। একই সঙ্গে চালকের আসনে থাকা সাদমান সাকিব ও গাড়িতে থাকা অপর একজনকে উত্তেজিত জনতা মারধর করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করে এবং চালক সাদমানকে হেফাজতে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে আসে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল রতন প্রাং বলেন, ঘটনাটির খবর পাওয়ার পরপরই আমরা আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। প্রাথমিক চিকিৎসাসহ আহত শিক্ষার্থীদের সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। চালকের আসনে থাকা ছেলেটির কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না, সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। সে বর্তমানে প্রক্টর কার্যালয়েই আমাদের হেফাজতে আটকে আছে।
দুর্ঘটনা এবং পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের বিষয়ে প্রক্টর আরও বলেন, এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ও আহত শিক্ষার্থীরা বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা দায়ের করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে কঠোর শাস্তি হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। তবে ঘটনার পরপরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা চালককে মেরে ফেলার উপক্রম তৈরি করাও কাম্য নয়। অ্যাক্সিডেন্ট তো ঘটতে পারে, কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মব জাস্টিস বা মেরে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। যা-ই হোক, আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত চালকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








