সৌদিগামী ৮৯ ফ্লাইট বাতিল, দুর্ভোগে সাড়ে ১৪ হাজার যাত্রী
ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির তীব্র অবনতি ঘটায় ঢাকা থেকে রিয়াদ ও দাম্মামসহ বিভিন্ন গন্তব্যের ফ্লাইট চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে বিমান চলাচলে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে করে গত চার দিনে সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে অন্তত ৮৯টি ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স। ফ্লাইট সূচি বিপর্যয়ের কারণে বিমানবন্দরে আটকে পড়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৪ হাজার ৬৫৫ জন সৌদিগামী যাত্রী।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এবং বেবিচকের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদের দেওয়া তথ্যে এই করুণ চিত্রের কথা জানা গেছে।
সংস্থাটি জানায়, সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামায় বিধিনিষেধ আরোপ করায় দেশের এয়ারলাইন্স খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিলের এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে, যা যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বেবিচকের হিসেব অনুযায়ী, বাতিল হওয়া মোট ৮৯টি ফ্লাইটের মধ্যে ৩৯টি হলো সরাসরি (ডাইরেক্ট) রুট এবং ৫০টি হলো ট্রানজিট রুট। সরাসরি পরিচালিত বাতিল ফ্লাইটের মধ্যে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৭টি, বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদি আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার ৫টি এবং রিয়াদ এয়ারের ৭টি ফ্লাইট রয়েছে।
অন্যদিকে, যেসব যাত্রী অন্য দেশের বিমানবন্দর হয়ে ট্রানজিটে সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল, তাদের ক্ষেত্রেও বড় বিপর্যয় ঘটেছে। বাতিল হওয়া ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইটের তালিকায় রয়েছে ভারতীয় বাজেট এয়ারলাইন্স ইন্ডিগোর সর্বোচ্চ ২২টি ফ্লাইট।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৬টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৬টি, ওমানের সালামএয়ারের ৪টি এবং ইজিপ্টএয়ারের ১টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। তবে বাতিল হওয়া এসব ফ্লাইটের কার্যক্রম ঠিক কবে নাগাদ পুনরায় শুরু হবে বা স্থগিত যাত্রীদের নতুন সময়সূচি কখন দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: সৌদিগামী ৮৬ ফ্লাইট বাতিল-স্থগিত, ভোগান্তিতে ১৩ হাজারের বেশি যাত্রী
বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব ও যাত্রী সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ ও ঢাকা-দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে, সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যথাসময়ে নতুন সময়সূচি ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত যাত্রীদের জানিয়ে দেওয়া হবে। একই সাথে জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীদের বিকল্প হিসেবে জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অপর দিকে, বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
মূলত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের ঘন ঘন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণেই সৌদি আরবের আকাশসীমা এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই মাস ধরে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মধ্যে সামরিক উত্তাপ বৃদ্ধি পায়। হুথিরা আগেই হুমকি দিয়েছিল সৌদির আকাশসীমা ব্যবহারকারী যেকোনো বিমানসংস্থাকে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। সেই হুমকির ধারাবাহিকতায় তারা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং তেল অবকাঠামোগুলোকে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। গত এক সপ্তাহেই এই বিমানবন্দরে অন্তত পাঁচবার হামলা চালানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াদ বিমানবন্দরে হওয়া হামলাগুলোতে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ১০ অক্টোবর (শনিবার) কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় ১২ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। ওই হামলায় বাংলাদেশিসহ আরও অন্তত ৩০৯ জন আহত হন। পরবর্তীতে ১১ অক্টোবর (রবিবার) রাতে বিমানবন্দরটিতে আবারও হামলা চালানো হলে এক পাকিস্তানি নাগরিক প্রাণ হারান এবং আহত হন ১১ জন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিমানবন্দর অবকাঠামো ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় এক পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন।
ধারাবাহিক এই প্রাণঘাতী হামলার প্রেক্ষিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে। এই সামরিক সংঘাত ও বিধিনিষেধের ফলে ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬ শতাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল ও দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটির ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের এই ব্যস্ততম রুটের স্বাভাবিক বিমান চলাচল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








