আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:২৪, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশসহ ৩১ মুসলিম দেশের ক্রুদের বাদ দিল এয়ার ফ্রান্স

বাংলাদেশসহ ৩১ মুসলিম দেশের ক্রুদের বাদ দিল এয়ার ফ্রান্স

ফাইল ছবি

ইসরায়েলের নতুন ও বিতর্কিত নিরাপত্তা নির্দেশনা অন্ধভাবে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বড় ধরনের আইনি ও নৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে ইউরোপের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিমান পরিবহন সংস্থা এয়ার ফ্রান্স। দেশটির কঠোর ও বৈষম্যমূলক শর্ত মেনে বাংলাদেশসহ ৩১টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকত্ব কিংবা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা পাইলট ও কেবিন ক্রুদের তেল আবিবগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রেখেছে ফরাসি এই বিমান সংস্থাটি। 

ফ্রান্সে স্থানীয় শ্রম আইন ও মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে এবং ফরাসি বৈষম্যবিরোধী আইনি মহলে এয়ার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

ফরাসি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম মিডিয়াপার্ট-এর একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ অক্টোবর ইসরায়েলের পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর জন্য একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করে। ওই নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়, ইসরায়েলি আকাশসীমা ব্যবহারকারী বা দেশটিতে ফ্লাইট পরিচালনাকারী কোনো বিমানের ক্রু বা পাইলটের এমন কোনো দেশের একক বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা চলবে না, যে দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ৩১টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান, ওমান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও নাইজারসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু রাষ্ট্র। ইসরায়েলি এই নির্দেশনার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, ফরাসি নাগরিকত্বধারী কোনো কর্মীর যদি জন্মসূত্রে কিংবা অন্য কোনো সূত্রে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত কোনো দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকে, তবে তিনিও এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন না। ফলে দীর্ঘ দিন ধরে ফরাসি পতাকাবাহী বিমানে সুনামের সঙ্গে চাকরি করা বহু দক্ষ ক্রু ও পাইলট আকস্মিকভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ হারাচ্ছেন।

ইসরায়েল সরকারের এই নির্দেশনার নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। আমিরাত ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের যৌথ ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাই-এর একটি উড়োজাহাজে মারাত্মক এক নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটার উপক্রম হয়। অভিযোগ ওঠে, ওই ফ্লাইটের এক ওমানি সহকারী পাইলট ইচ্ছাকৃতভাবে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটিকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে বা জনবহুল এলাকায় বিধ্বস্ত করার চেষ্টা চালান। ওই সময় উড়োজাহাজটির ভারতীয় পাইলটের সঙ্গে তাঁর হাতাহাতি ও সংঘাতের ঘটনাও ঘটে। এই ঘটনার পরপরই ইসরায়েল সরকার দেশের বিমান পরিবহন নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলে এ ধরনের একপাক্ষিক ও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন: সৌদি-হুতি সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব ইরানের

এদিকে মিডিয়াপার্টের হাতে আসা এয়ার ফ্রান্সের একটি অভ্যন্তরীণ স্মারক ও বার্তার মাধ্যমে জানা গেছে, ফরাসি এই বিমান সংস্থাটি ইসরায়েলের এই শর্ত মেনে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকর করেছে। এয়ার ফ্রান্স তাদের সব পাইলট এবং কেবিন ক্রুদের দ্রুত তাদের দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি অভ্যন্তরীণ ওই বার্তায় কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই নির্দেশনা অমান্য করলে বা গোপন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মী ও সংস্থাকে চরম শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এয়ার ফ্রান্সের কাছে এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও সংস্থাটি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে এয়ার ফ্রান্স দায়সারাভাবে জানায় যে, অন্য সব বিমান সংস্থার মতো তারা যেসব দেশে সেবা দেয়, সেসব দেশের কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রবেশবিধি গ্রাহক ও কর্মীদের ক্ষেত্রে মেনে চলতে আইনগতভাবে বাধ্য। তবে ইসরায়েলি এই নিয়ম জারির ফলে বিশ্বজুড়ে চলাচলকারী ডজন ডজন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

চেক প্রজাতন্ত্রের বৃহত্তম বিমান সংস্থা স্মার্টউইংস জানিয়েছে যে, তারা সেপ্টেম্বরেই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই নির্দেশনা হাতে পেয়েছে। তবে তাদের বর্তমান কার্যক্রমে এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব না পড়লেও তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইসরায়েলি শর্ত মেনে চলার নীতিতে অচল রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন বিমান সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারলাইনসসহ অন্যান্য প্রধান এয়ারলাইনসগুলো এই স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল এয়ার ফ্রান্সই নয়, খোদ ইসরায়েলের স্থানীয় বিমান সংস্থাগুলোও এই নির্দেশনার পর নড়েচড়ে বসেছে এবং তাদের প্রায় আড়াই হাজার পাইলট ও কেবিন ক্রুর অতীত ইতিহাস ও পাসপোর্টের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা শুরু করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্দেশনায় প্রত্যক্ষভাবে কোনো ধর্মের নাম উল্লেখ করা না হলেও, যে ৩১টি দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তার প্রায় সবই মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর ফলে জাতীয়তার অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে, যা পরিষ্কারভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শামিল। প্যারিসভিত্তিক বিশিষ্ট বৈষম্যবিরোধী আইনজীবী ক্লারা গানদিন ফরাসি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও বেআইনি বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বিদেশি কোনো সরকার বা ভূরাজনৈতিক শক্তির বৈষম্যমূলক ও সামষ্টিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ফরাসি শ্রম আইনের আওতাধীন কর্মীদের অধিকার খর্ব করা যায় না। এয়ার ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত কর্মীদের প্রতি সরাসরি বৈষম্যমূলক হয়রানি এবং এটি ফরাসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শ্রম আইন এবং মানবাধিকার নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। এর ফলে ফরাসি আদালতে এয়ার ফ্রান্সকে বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ ও মামলার মুখোমুখি হতে হবে বলে তিনি জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পেশাদার বিমানকর্মীরা এই আকস্মিক পদক্ষেপে চরম পেশাগত অনিশ্চয়তা ও মানসিক আঘাতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের জাতীয়তাভিত্তিক বৈষম্যমূলক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নাম করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশি বিমান সংস্থার ওপর এমন একপাক্ষিক নাগরিকত্বভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি বৈশ্বিক বিমান চলাচল শিল্পের দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক ও পেশাদার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়