নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৩৮, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ২০:৩৯, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বিরোধী দল না এলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিরোধী দল না এলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও এখতিয়ার স্পষ্ট করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্য গঠনপ্রক্রিয়া নির্ধারণ, সংসদীয় উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্বের কাঠামো তৈরি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয়কে মৌলিক অধিকারের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। 

একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের বিদ্যমান পদ্ধতিতে নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতার ভারসাম্য রক্ষা, মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিধান পুনর্বিবেচনা এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের সাংবিধানিক সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট করার বিষয়েও মতামত এসেছে। তবে এসব প্রস্তাবের কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়নি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এসব মতামত তুলে ধরেন। 

বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। 

তার ভাষায়, বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ। জুলাই জাতীয় সনদে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অথচ দেশের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন এমন বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞরা জুলাই জাতীয় সনদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘদিনের জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে সংবিধানের বেশ কয়েকটি মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন।

প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার এখতিয়ার সুনির্দিষ্ট করার বিষয়টি বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্ব পায়। আলোচকরা বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানের ব্যাখ্যা প্রদান এবং মৌলিক কাঠামোর সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার কী হবে, তা স্পষ্ট করার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ) মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিশ্চিত করতে একটি অঙ্গ যেন অন্য অঙ্গের ওপর কোনো ধরনের খবরদারি চালাতে না পারে সেই ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়। সংবিধান ব্যাখ্যার নামে যেন জনপ্রত্যাশা উপেক্ষিত না হয়, তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে।

দ্বিতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময়ই ঐকমত্য হয়েছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কেবল শেষ বিকল্প বা লাস্ট রিসোর্ট হিসেবে বিবেচনা করা হবে। 

বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা মত দেন, রাষ্ট্রপতির ভূমিকায় পৌঁছানোর আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য না পাওয়া গেলে শেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে অনেক আলোচক লিখিত আকারে আরও স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে থেকেই একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা বা উচ্চকক্ষ কীভাবে গঠন করা যায় তা নিয়ে বিশদ মতামত উপস্থাপন করা হয়েছে। উচ্চকক্ষে বিভিন্ন জেলা বা অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্ব থাকবে নাকি পেশাজীবী বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি ঘটবে, কিংবা দলীয় প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিধি নির্বাচন হবে এমন নানা বিকল্প নিয়ে শিক্ষাবিদরা আলোকপাত করেছেন। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী বৈঠকে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় দুটি সেনাক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত

চতুর্থত, সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদকে দেশের বস্তুগত ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনায় মৌলিক অধিকারের ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার জোরালো সুপারিশ এসেছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগণের সার্বভৌমত্ব-এর সংজ্ঞাকে আরও সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট ও আধুনিক করার প্রস্তাবও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পঞ্চমত, সংবিধান সংশোধনের বর্তমান প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে নমনীয়তা ও স্থায়িত্বের সঠিক সামঞ্জস্য নিশ্চিতের কৌশল নিয়ে মতবিনিময় হয়। বর্তমানে কার্যকর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে গিয়ে গণভোট বা বিকল্প কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রাখা যায় কি না তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত হওয়া মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত বিধানগুলো নতুন করে পুনঃমূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়।

সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব না থাকা ও রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে বৈঠকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। 

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এই সংস্কার কার্যক্রমটি মূলত জুলাই জাতীয় সনদ এর ভিত্তিতেই পরিচালনা করা হচ্ছে, যা প্রণয়ন করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ওই কমিশনের প্রধান ছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং সহসভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

সরকার ও গঠিত বিশেষ কমিটি প্রথম থেকেই বিরোধী দলসমূহকে লিখিত মতামত প্রদানের জন্য এবং কমিটিতে প্রতিনিধির নাম প্রেরণের জন্য বারবার আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানিয়ে আসছে। সংসদীয় সেশনের পাশাপাশি কমিটির যেকোনো পর্যায়ে তাদের অংশ নেওয়ার দরজা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং তারা এলে সরকার তাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাবে। সরকার চায় সব দল ও মতের সমঝোতার ভিত্তিতেই সংবিধানের এই বিশাল রূপান্তর ঘটুক।

তবে রাজনৈতিক মাঠের কোনো কৌশল বা বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত না আসার অজুহাতে জাতীয় সংস্কার প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে না। জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও জনগণের বহুল প্রতীক্ষিত সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করা বর্তমান সরকারের প্রধান দায়বদ্ধতা। তাই সংসদে বিল উত্থাপিত হওয়ার পর অন্তত বিরোধী দল সেখানে ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থেকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেন। 

তাদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, চিন্তাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এইচ লুৎফুল এলাহী, অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম ও অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান ও অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদ সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রথিতযশা শিক্ষকবৃন্দ।

সংবিধান সংশোধন বা সংশোধনের এই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়াকে অধিকতর আইনগত ভিত্তি দিতে এবং কারিগরি দিকগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে আগামী ২৪ অক্টোবর (শনিবার) পরবর্তী বৈঠক নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন দিনব্যাপী এক বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।

উক্ত সেশনে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি এবং দেশের প্রখ্যাত সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করা হবে। আইনি ও সংবিধান সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনার কারণে বাদ না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই এবার দিনব্যাপী আলোচনার এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়