হামলার জেরে সৌদির ফ্লাইট বিপর্যয়ে অনিশ্চয়তায় হাজারো কর্মী
ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ঢাকা থেকে রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দাগামী একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় ফাঁকা হয়ে পড়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বহির্গমন টার্মিনাল।
যে প্রাঙ্গণে সচরাচর বিদেশগামী কর্মী ও তাদের বিদায় জানাতে আসা স্বজনদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেগ পেতে হয়, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সরেজমিনে সেখানে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। এয়ারলাইন্সগুলোর অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কড়া নির্দেশনার পর নতুন করে যাত্রীরা আর বিমানবন্দরে আসেননি।
শ্রীলঙ্কাগামী পর্যটক নাসির উদ্দীন ও তার সঙ্গী হাবিবুর রহমান জানান, এর আগে ভারত, মালয়েশিয়া ও নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকলেও শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন খাঁ খাঁ রূপ তারা আগে কখনও দেখেননি। আগে যেখানে ভিড় ঠেলে চেক-ইন লাইনে দাঁড়াতে হতো, আজ পুরো এলাকা নির্জন।
কাতারগামী যাত্রী আরিফুর রহমান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক বহির্গমন টার্মিনালের পরিচিত সেই হাঁকডাক আর ব্যস্ততা একেবারেই নেই। শত শত মানুষ গন্তব্যে যেতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন, যা দেখে সত্যিই খারাপ লাগছে। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছেও কোনো সুসংবাদ পাননি।
যশোরের যাত্রী সবুজ ও ফেনীর মোহাম্মদ রাব্বি জানান, শেষ মুহূর্তে এসে তাদের ফ্লাইটের খবর অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সবুজ রাতে ফের যশোরে ফিরে গেছেন। তবে ভিসার মেয়াদের শেষ প্রান্তে থাকা রাব্বি ও শুক্কুর মিয়াদের ছুটি শেষে চাকরিতে ফেরা এখন চরম সংশয়ের মুখে পড়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি পরিস্থিতির জেরে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও বিভিন্ন ট্রানজিট রুটে এখন পর্যন্ত মোট ৬১টি ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে সরাসরি ভোগান্তিতে পড়েছেন ৯,৬৭৪ জন প্রবাসী ও সাধারণ যাত্রী। তবে বেবিচকের এই তালিকার বাইরে থাকা রিয়াদ এয়ারের নিজস্ব হিসেব যুক্ত হলে ভুক্তভোগী যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়বে। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ৫টি এবং রিয়াদ এয়ারের ৭টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৬১ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে ৯ হাজারের বেশি যাত্রী
পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রুটের বিভিন্ন বিমান সংস্থা যেমন ইন্ডিগো, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই, সালাম এয়ার ও ইজিপ্ট এয়ারের মোট ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৭ অক্টোবর এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব শিডিউল স্থগিত ঘোষণা করেছে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ায় আটকে পড়া যাত্রীদের চরম দুর্দশা কমাতে এয়ারলাইন্সগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ৭টি নির্দেশনা দিয়েছে বেবিচক।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানানো হয়, প্রতিটি বাতিল, বিলম্বিত বা পুনঃতফসিলকৃত ফ্লাইটের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাত্রীকে খুদে বার্তা, ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানাতে হবে। পাশাপাশি কোনো ফ্লাইটের যাত্রা নিশ্চিত হওয়া ব্যতীত সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের বিমানবন্দরে না আসার নির্দেশ স্পষ্ট ভাষায় প্রচার করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া এয়ারলাইন্সগুলোকে বিনামূল্যে টিকিটের তারিখ পরিবর্তন ও টাকা ফেরতের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। যেসকল প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, তাদের জন্য সৌদি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় স্থাপনে দিকনির্দেশনা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছে যাওয়া যাত্রীদের জন্য খাবার, পানীয় জল ও বসার সুব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রবীণ, শিশু ও অন্য রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়।
প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করতে বলা হয়েছে, যিনি বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে যাত্রীদের সহায়তা ও তথ্য সমন্বয় করবেন। বেবিচক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনো যাত্রীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না এবং সবার সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে।
গত ১০ অক্টোবর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে বাংলাদেশী নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন হতাহত হন এবং সুরক্ষার স্বার্থে বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সিকিউরিটি ও এয়ারলাইন্সগুলো সৌদি আরবের স্পর্শকাতর আকাশসীমা এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদ উল আলম জানান, এভিয়েশন সুরক্ষার স্বার্থেই এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকিমুক্ত থাকাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান যেহেতু প্রধানত সৌদি আরবকেন্দ্রিক, তাই প্রবাসীদের চাকরি ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবিলম্বে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করা উচিত, যাতে ফ্লাইট স্থগিতের কারণে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ জরিমানা বা অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








