নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:০০, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

রোহিঙ্গাদের এনআইডি-পাসপোর্ট জালিয়াতি রোধে ফিরছে ভেরিফিকেশন

রোহিঙ্গাদের এনআইডি-পাসপোর্ট জালিয়াতি রোধে ফিরছে ভেরিফিকেশন

ফাইল ছবি

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অসাধু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করছেন কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গারা। শুধু টেকনাফেই গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ভুয়া এনআইডি হাতিয়ে নিয়েছে। পাসপোর্ট প্রদানে পুলিশি যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা শিথিল থাকার সুযোগে একটি চক্র এই অপকর্ম চালিয়ে আসলেও, বিষয়টি এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে পাসপোর্টের আবেদন যাচাইয়ে পুনরায় পুলিশ ভেরিফিকেশন চালুর জোরালো চিন্তা করছে সরকার।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলাজুড়ে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী জালিয়াত চক্র। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এরা রোহিঙ্গাদের জন্য ভুয়া এনআইডি ও পাসপোর্টের ব্যবস্থা করছে। এর আগে কঠোর পুলিশি ভেরিফিকেশনের কারণে রোহিঙ্গাদের পক্ষে পাসপোর্ট পাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে পাসপোর্ট প্রদানে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার পরিপত্র জারির পর থেকেই চক্রটি এই সুযোগের অপব্যবহার শুরু করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বহিরাগমন অনুবিভাগ) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ জানান, ভেরিফিকেশন ছাড়া পাসপোর্ট প্রাপ্তি সহজ হওয়ায় রোহিঙ্গারা এর ফায়দা নিচ্ছে। ইতিমধ্যেই যাদের হাতে ভুয়া এনআইডি চলে গেছে, তারা সহজেই পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে। তবে জালিয়াতির মাধ্যমে এ পর্যন্ত ঠিক কতজন রোহিঙ্গা পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে মন্ত্রণালয়। রোহিঙ্গাদের এনআইডিগুলোর সত্যতা যাচাই করে ভুয়া পরিচয়পত্রগুলো শনাক্ত ও ব্লক করে দেওয়ার বিষয়ে এনআইডি অনুবিভাগের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: হারানো পাসপোর্ট রি-ইস্যুতে ১০ হাজার টাকা জরিমানা

অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে এই জালিয়াতি সবচেয়ে প্রকট। বিশেষ করে সাবরাং ইউনিয়নেই ভুয়া এনআইডিধারীর সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্যমতে, জালিয়াতির এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় ও তথ্য হুবহু ব্যবহার করা হয়। যেমন অন্য কোনো অঞ্চলের কোনো নাগরিকের এনআইডি নম্বর, নাম ও পিতার নাম ঠিক রেখে ছবি বা অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করে রোহিঙ্গা পুরুষ ও নারীদের জন্য পাসপোর্টের আবেদন করা হচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ বা অন্যান্য ধাপে ধরা পড়লেও, যারা ফাঁকি দিতে পারছেন তারা পাসপোর্ট হাতে পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের সহায়তায় জেলায় অন্তত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশি এনআইডি সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া এনআইডি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসলেও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।

এদিকে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন পুনরায় ফিরিয়ে আনার জোরালো আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই দুই জেলার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসগুলোতে আবেদন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বর্তমানে শুধু এনআইডি দেখেই নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে না; বরং আবেদনকারীর চাকরি বা ব্যবসার ধরন, স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়ন এবং পরিবারের বিস্তারিত পরিচয় নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপসহকারী পরিচালক মো. শহিদ উল্যাহ বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে রোহিঙ্গারা হয়তো অন্য জেলায় গিয়ে পাসপোর্টের চেষ্টা করে থাকতে পারে, তবে এখানে সেই সুযোগ নেই। পুলিশ ভেরিফিকেশন না থাকলেও আমরা নিজেদের উদ্যোগে বহুমুখী উপায়ে তথ্য যাচাই করছি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল পাসপোর্টের আবেদন পর্যায়ে নয়, বরং এনআইডি প্রদানের প্রাথমিক ধাপেই কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা গেলে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চিরতরে রোধ করা সম্ভব। দেশ ও জাতির স্বার্থে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে জালিয়াতিচক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়