আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:২৭, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের বার্তা

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের বার্তা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, হত্যা ও অন্যান্য সহিংসতার অভিযোগের বিষয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরে এসব ঘটনার সুরাহায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি প্রত্যাশা জানিয়েছে ভারত। তবে এ বিষয়ে অতীত বা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি কোনো দোষারোপ না করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়েছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও তুলে ধরেছে দেশটি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত দ্বিসাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ সরকার এসব বিষয়ের সুরাহা করবে। 

দুর্গাপূজার প্রাক্কালে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দেওয়া একটি বিবৃতিতে সংখ্যালঘুদের ওপর গত তিন মাসে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ভারতের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিবিসির এক সাংবাদিক ঐক্য পরিষদের বিবৃতির উল্লেখ করে বলেন, গত তিন মাসে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হত্যাকাণ্ডসহ ১৪১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে। এসব ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বলেও বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার বিষয়টিও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো অতীতেও এ ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উল্লেখ করে সাংবাদিক জানতে চান, এ বিষয়ে ভারতের সরকারের অবস্থান কী।

জবাবে জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ সরকার এসব বিষয়ের সমাধানে পদক্ষেপ নেবে বলে ভারত প্রত্যাশা করে। বক্তব্যে তিনি অভিযোগগুলোর সত্যতা, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা সংশ্লিষ্ট ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। ফলে ভারতের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সুরাহায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হবে এমন প্রত্যাশা।

এদিকে, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথের পাঠানো এক বিবৃতিতে কড়া পাহারায় সারা দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গাপূজা আয়োজনের পরিস্থিতিকে দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করা হয়। 

সংগঠনটির দাবি, সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে।

বিবৃতিতে গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের আংশিক চিত্র তুলে ধরে ঐক্য পরিষদ জানায়, এ সময়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৬টি এবং ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে চারটি। মন্দিরে হামলা, লুটপাট, জায়গা দখল ও বিগ্রহ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের ওপর হামলার সাতটি, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ১১টি এবং হামলা, ছিনতাই, ডাকাতি ও মারধরের ২৬টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ঢাকার সঙ্গে গঠনমূলক ও ইতিবাচক সম্পর্ক চায় নয়াদিল্লি

সংগঠনটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জমি ও সম্পত্তি দখলের ঘটনা ১৪টি, অপহরণ, হত্যার হুমকি ও হয়রানির ঘটনা তিনটি এবং চাঁদাবাজির ঘটনা চারটি। অন্যান্য শ্রেণিতে আরও ১৪টি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ছয়জনকে আটকের বিষয়টিও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংগঠনটি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার অভিযোগগুলোর যথাযথ প্রতিকার দাবি করেছে। তবে বিবৃতিতে উল্লিখিত ঘটনাগুলোর স্বাধীন যাচাই, প্রতিটি অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ কিংবা মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

একই সংবাদ সম্মেলনে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। 

দ্য হিন্দুর এক সাংবাদিক জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও তার পরিবর্তে দেশটির স্বরাষ্ট্রসচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। বাংলাদেশ থেকে উচ্চপর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব না করার ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে ভারতের বক্তব্য জানতে চান। এর আগে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণ ও তার অংশগ্রহণ না করার প্রসঙ্গও প্রশ্নে উঠে আসে।

তবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন বৈঠকে অংশ নেননি, কিংবা এ বিষয়ে ভারতের কোনো অসন্তোষ রয়েছে কি না এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি জয়সওয়াল। তিনি বরং বৈঠকের সামগ্রিক ফলাফল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। 

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিমসটেকের সব সদস্যদেশ অংশ নেয় এবং বৈঠক শেষে দিল্লি ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়।

জয়সওয়াল জানান, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, মাদক পাচার প্রতিরোধ এবং অর্থপাচারবিরোধী কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে সদস্যদেশগুলো অঙ্গীকার করেছে। আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করার সুযোগও চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সংলাপের মধ্য দিয়ে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।

ভারতের এ বক্তব্যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের সুরাহার প্রত্যাশা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের বিষয় দুটি সামনে এসেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগগুলোর তদন্ত ও প্রতিকার কীভাবে এগোবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ এবং অভিযোগগুলোর যথাযথ অনুসন্ধানের ওপর। 

অন্যদিকে, বিমসটেকের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও অর্থপাচারের মতো আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে ভারতের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়