বারবার ধাক্কায় দুর্বল বিশ্ব অর্থনীতি, সতর্ক করল আইএমএফ
ছবি: সংগৃহীত
বারবার আসা নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সামর্থ্য ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও সরকারি তহবিলের ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের কাছে থাকা নীতিগত নিরাপত্তা বলয় বা বাফার এখন অনেকটাই তলানিতে। বিশ্বজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের কারণে ঋণ পরিশোধের চাপ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এই বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মাঝেই আগামী ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ৩.১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আয়োজিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলনের এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার গ্লোবাল পলিসি এজেন্ডা (বৈশ্বিক নীতি কর্মপরিকল্পনা) উপস্থাপনকালে এসব তথ্য ও সতর্কবার্তা জানান আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
এই প্রাক্কলন গত এপ্রিলের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশের তুলনায় স্পষ্টতই কম। আইএমএফপ্রধান জানান, বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে শক্তভাবে প্রাথমিক ধাক্কাগুলো সামলে উঠলেও ক্রমাগত বিঘ্ন ও অচলাবস্থা কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্ব অর্থনীতির এই স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির হারের আড়ালে মূলত চরম বৈষম্য ও দুটি বিপরীতমুখী অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব লুকিয়ে রয়েছে। একপক্ষে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে এবং জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি বৈশ্বিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শেয়ারবাজারকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা রাখছে। এই ভিন্নমুখী বাস্তবতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থনৈতিক সুবিধার বণ্টন চরম অসম হয়ে পড়েছে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনৈতিক মানচিত্রে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। যেসব দেশ সরাসরি সংঘাতের শিকার নয় এমন জ্বালানি রপ্তানিকারক রাষ্ট্র এবং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো প্রযুক্তিগত মূল্য শৃঙ্খলের (ভ্যালু চেইন) সঙ্গে যুক্ত দেশগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর বিপরীতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর, সীমিত আর্থিক বাফার এবং এআই বা প্রযুক্তির এই উল্লম্ফন থেকে দূরে থাকা স্বল্প আয়ের ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলো সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে আয় বৈষম্য আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২%, মূল্যস্ফীতি ১০.৯%, আইএমএফের সতর্কবার্তা
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণের পরিমাণ সর্বকালের অন্যতম রেকর্ড সৃষ্টি করে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সরকারি বন্ডের ইল্ড বা আয় বেড়ে যাওয়ায় উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে আয় কমে যাওয়া এবং উন্নয়ন সহায়তা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি ঋণের সুদের চড়া হার পরিশোধ করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ নিশ্চিত করেছে যে তারা 'কমন ফ্রেমওয়ার্ক'-এর আওতায় এসব নিম্ন আয়ের দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির বাইরেও বেশ কিছু উদীয়মান হুমকি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। খাদ্যবাজারে এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতকে ঘিরে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সংশোধন বা ধসের আশঙ্কা, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, ভূ-রাজনৈতিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং প্রযুক্তি খাতের অত্যধিক লিভারেজ বা ঋণনির্ভরতা নতুন উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ক্রমশ বাড়তে থাকা সাইবার হুমকি এখন সরাসরি বস্তুগত ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফ্রান্সের এক রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থার সাইবার হামলার উদাহরণ টেনে জর্জিয়েভা সতর্ক করেন যে, ঘন ঘন সাইবার আক্রমণ এখন পুরো বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতাকে অচল করে দেওয়ার মতো হুমকি তৈরি করেছে।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বেশ কিছু কৌশলগত নীতিগত সুপারিশ প্রদান করেছে।
আইএমএফের মতে, বর্তমানে ব্যাপকভাবে ঢালাও দাম নিয়ন্ত্রণের কৌশল কার্যকর নয়; বরং পণ্যের দামের চেয়ে জনগণের সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সাময়িক সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া উচিত। একইসঙ্গে সব দেশের জন্য বিশ্বাসযোগ্য ও কঠোর রাজস্ব সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি হলেও, তা যেন প্রতিটি দেশের নিজস্ব আর্থিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রয়োগ করা হয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনবোধে সাময়িকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করা যেতে পারে, তবে এটি স্থায়ী অর্থনৈতিক নীতি সমন্বয়ের বিকল্প নয়।
সাইবার ঝুঁকি ও আর্থিক জালিয়াতি সামাল দিতে আইএমএফ ঘোষণা করেছে তাদের ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক জালিয়াতি প্রতিরোধ করা।
তবে সব ঝুঁকির মধ্যেও প্রযুক্তির ইতিবাচক রূপান্তরের আশাবাদ প্রকাশ করে আইএমএফ জানায়, সঠিক বিনিয়োগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী এক দশকের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার জিডিপি ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব।
পরিশেষে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজেদের আন্তর্জাতিক নজরদারি ও সহায়তা কর্মসূচিকে আরও গতিশীল, সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য করতে নিজেদের নীতিমালায় ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








