আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:১২, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ১৬:১৪, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

সুন্দরী প্রতিযোগিতা স্থগিত করে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড চালু বুরকিনা ফাসো

সুন্দরী প্রতিযোগিতা স্থগিত করে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড চালু বুরকিনা ফাসো

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবমর্যাদা সমুন্নত রাখতে প্রচলিত রূপচর্চা ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা স্থগিত করে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসো। বাহ্যিক সৌন্দর্যের মোড়ক সরিয়ে নারীদের মেধা, মনন ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে দেশটিতে চালু করা হয়েছে হাকিলি মুসো (Hakili Muso) নামের এক অনন্য জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা। এই উদ্যোগকে দেশটির সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীর ক্ষমতায়নের পথে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লষকরা।

গত জুনে দেশটির যোগাযোগ, সংস্কৃতি, শিল্প ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশটিতে চলমান সব ধরনের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবমর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন দেশব্যাপী সব ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতা বন্ধ থাকবে। ঠিক তার দুই মাস পর আগস্টে তরুণীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে প্রবর্তন করা হয় হাকিলি মুসো প্রতিযোগিতা।

উদ্বোধনী এই আসরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২০২৬ সালে বিজ্ঞানে ব্যাকালোরেট বা উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের ডিগ্রি অর্জনকারী ৮৪ জন মেধাবী তরুণী অংশ নেন। মূল প্রতিযোগিতার আগে তাদের নিয়ে এক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ প্রস্তুতিমূলক বা বুট ক্যাম্প কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। এরপর গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো জটিল বিষয়ে নিবিড় লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেন প্রতিযোগীরা। প্রতিটি বিষয়ে সেরা পাঁচজন করে প্রতিযোগী বিজয়ী নির্বাচিত হন। প্রতিটি বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকারীদের আকর্ষণীয় পুরস্কার হিসেবে ২০ লাখ সিএফএ ফ্রাঁ, একটি করে উন্নতমানের মোটরসাইকেল, ল্যাপটপ এবং মূল্যবান শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের আদলে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বিরোধীরা: রাজনাথ সিং

প্রতিযোগিতা সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর ২১ সেপ্টেম্বর বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ও সামরিক সরকারের প্রধান ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বিজয়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে তিনি তরুণীদের নিজেদের মেধা ও শক্তির ওপর দৃঢ় আস্থা রাখার আহ্বান জানান। বিজ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার পাশাপাশি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের পরামর্শ দেন তিনি।

পশ্চিম আফ্রিকান সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা শিকড় গেড়ে আছে যে, বিজ্ঞানভিত্তিক পেশা ও উচ্চশিক্ষা মূলত পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত। মূলত এই লিঙ্গভিত্তিক ও প্রচলিত ধ্যানধারণাকে ভুল ও অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতেই হাকিলি মুসো প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বুরকিনা ফাসো সরকার। শিক্ষা ও পেশাগত সহায়তার মাধ্যমে তরুণীদের বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে উৎসাহিত করাই এই নীতির মূল লক্ষ্য।

ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকারের এই সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একদল নেটিজেন এর ভূয়সী প্রশংসা করে একে সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। টেলস অব আফ্রিকাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত এই সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় অনেকে মন্তব্য করেছেন যে, একজন নারীকে শিক্ষিত করা মানে একটি পুরো পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করা। অন্য দেশগুলোরও নারীদের বৈজ্ঞানিক সাফল্য উদ্‌যাপনে এমন অনুসরণীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবে এর বিপরীতে কিছু সমালোচক মনে করছেন, বিজ্ঞানের প্রসার ঘটাতে গিয়ে নারীদের নিজস্ব পছন্দের স্বাধীনতা ও নারীত্ব উদ্‌যাপনের সুযোগকে পুরোপুরি পাশ কাটানো উচিত নয়।

সামগ্রিক বিবেচনায়, প্রথাগত সুন্দরী প্রতিযোগিতার বৃত্ত ভেঙে বুরকিনা ফাসো সরকার তরুণীদের মেধা ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতাকে সামনে নিয়ে আসার যে পথচলা শুরু করেছে, তা কেবল আফ্রিকার গণ্ডিতেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়