কাতার থেকে মার্কিন সেনা সরাচ্ছে ওয়াশিংটন
ছবি: সংগৃহীত
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির মুখে কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘আল উদেইদ’ থেকে সেনাসদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে, তেহরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, ইরানি ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসি জানিয়েছে, বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যার মধ্যে কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে মার্কিন সামরিক সদস্যদের একটি অংশকে সরে যেতে বলা হয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, তিনজন অজ্ঞাতনামা কূটনীতিকের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। যদিও কূটনীতিকরা স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো বাধ্যতামূলক সরিয়ে নেওয়া (ইভাকুয়েশন) নয়, বরং সামরিক অবস্থান বা “পোশ্চার চেঞ্জের” অংশ।
আল-উদেইদ ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা অবস্থান করছে। তবে কাতারের মার্কিন দূতাবাস এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। একইভাবে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
একজন কূটনীতিক জানিয়েছেন, ঘাঁটি থেকে সেনাদের সরানোর কারণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা নেই।
তবে এই পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে ইরানে চলমান বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে যে ইরানে বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষায় হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে। সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্কসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানী নিরাপত্তা বাহিনীও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ঘোষণা করেছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিমান বাহিনীর কমান্ডার সরদার মুসাভি জানিয়েছেন, যেকোনো মার্কিন আগ্রাসনের মোকাবিলায় ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
আরও পড়ুন: ইরান পরিস্থিতি: রাজপথ শান্ত হলেও কাটেনি সংঘাতের শঙ্কা
তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের পর ক্ষেপণাস্ত্র মজুত আরও বেড়েছে এবং যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতিও সম্পূর্ণভাবে মেরামত করা হয়েছে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ ভিডিওগুলোর মাধ্যমে অনেকেই আটক দেখানো হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ২ হাজার ৪০৩ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৪৭ জন সরকারি কর্মী নিহত হয়েছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ ২ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। প্রসিকিউটররা ‘নাশকতাকারীদের’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে শুরু করেছেন।
এর আগে, গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।
আঞ্চলিক কূটনীতি নিয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করে সংকট নিরসনে সংলাপের গুরুত্ব প্রকাশ করেছেন।
তুর্কি কূটনীতিক সূত্র জানিয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা এড়াতে সংলাপই একমাত্র পথ। একই সঙ্গে আঙ্কারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও স্থগিত আছে।
তেহরান আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তবে তাদের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা করা হবে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে এই অস্থিরতায় নিরাপত্তা কর্মীসহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন প্রাণ হারিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি ইরানের সরকার বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তবে তিনি ‘অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা’ নেবেন।
এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের অবস্থান পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে, যা ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, বিবিসি, এইচআরএএনএ
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








