News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৩৯, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

ইরান পরিস্থিতি: রাজপথ শান্ত হলেও কাটেনি সংঘাতের শঙ্কা

ইরান পরিস্থিতি: রাজপথ শান্ত হলেও কাটেনি সংঘাতের শঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত

কয়েক দিনের টানা অস্থিরতা ও সহিংসতার পর ইরানের পরিস্থিতি আপাতত অনেকটাই শান্ত। রাস্তায় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের মাত্রা কমেছে, এবং সরকারের পক্ষে বড় সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এই শান্ত পরিবেশের আড়ালেই রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠা। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা বেড়ে গেছে, পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারের নামে সরকার আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকে যে অস্থিরতা সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল, তার মাত্রা ক্রমেই কমে আসছে। 

এর আগে গত সোমবার সরকারের পক্ষে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন। দেশটির নেতৃত্ব এই জমায়েতকে এক ধরনের ‘সবুজ সংকেত’ হিসেবে দেখছে এবং এর ভিত্তিতেই তারা দাঙ্গাবাজ বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে চাইছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কিছু অস্ত্রধারী অজ্ঞাত ব্যক্তির ছবি দেখানো হয়েছে, যেখানে তাদের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাতে দেখা যায়।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে বড় ধরনের অস্থিরতা না থাকায় বিক্ষোভ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, গত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় আমি কোনও বিক্ষোভ দেখিনি, এবং কোনও দাঙ্গাও চোখে পড়েনি। 

ইজাদি ইন্টারনেটের ওপর চলমান বিধিনিষেধকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলছেন। তিনি গত বছরের জুনে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় মোসাদের সদস্যদের ইরানের অবকাঠামো ব্যবহার করে যোগাযোগ চালানো এবং কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার পরিচালনার প্রসঙ্গ টেনেছেন।

ইজাদি আরও দাবি করেছেন, বিক্ষোভের সময় কিছু ‘দাঙ্গাবাজ’ পুলিশ সদস্য ও দোকানদারদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল, বিশেষ করে যারা দোকান বন্ধ করতে অস্বীকার করেছিল। 

তিনি বলেন, আমরা দেখেছি দাঙ্গাবাজরা দোকানদারদের হত্যা করেছে।

আল জাজিরা জানিয়েছে, গত সোমবার সকাল থেকে ক্রমেই সরকারপন্থি সমাবেশ ও মিছিলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, আর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কমে যাচ্ছে। 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, সহিংসতায় নিহত শতাধিক মানুষের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ নাগরিকরা অন্তর্ভুক্ত। পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্থিতিশীল হয়েছে।

আরও পড়ুন: বিক্ষোভ দমনে কঠোর তেহরান: এরফানের মৃত্যুদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইঙ্গিত দিয়েছে, তবে এখনও কোনো সরকারি সূত্র থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরানের বিচারব্যবস্থায় কাউকে ‘মোহারেবেহ’ অর্থাৎ ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’-এর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হলে, আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকির পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বিভিন্ন দেশের সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন এবং ভবিষ্যতে যেকোনও পরিস্থিতির জন্য ইরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। 

আল জাজিরাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তুলনায় এখন ইরানের সক্ষমতা গুণগত ও পরিমাণগত—দুই দিকেই আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী তৎপরতার খবর এলেও তেহরান শহরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। নগরজীবন স্বাভাবিকভাবে চলছে। 
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত কিছু এজেন্ট দেশে অস্থিরতা তৈরি করে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে ব্যর্থতার পর ট্রাম্প সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ঘোষণা দেন। এর ফলে ইরানে মুদ্রার দাম বৃদ্ধি পায়, যার কারণে বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভে নামেন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তখন ইরানি জনগণকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। এই মন্তব্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ভেতর থেকে ‘ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন’ পশ্চিমাদের এজেন্ডায় রয়েছে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেন, দেশে সাম্প্রতিক দাঙ্গা ও সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সরাসরি ভূমিকা স্পষ্ট। 

তার ভাষায়, বিদেশি হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরি করতে এবং ভেতরে গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে তারা পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। 

তিনি অভিযোগ করেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতারা ইরানের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাতে তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গাকারীরা সরকারি ও জনগণের সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালানোর পর এই মন্তব্য করেন লারিজানি। 

সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, গত জুনে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের শত্রুতা পরিত্যাগ করেননি। তারা হাইব্রিড যুদ্ধের মাধ্যমে আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা জবাববিহীন থাকবে না। 

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মার্কিন সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী ইরানে সহিংস দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অভিযোগকে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সাবেক সিআইএ পরিচালক প্রকাশ্যে মোসাদ ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা ফাঁস করেছেন। আরাকচি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বিভ্রম হলো আগুন শেষ পর্যন্ত অগ্নিসংযোগকারীকেই পোড়াবে না।

ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের ন্যায্য অর্থনৈতিক দাবির ভিত্তিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সামরিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। বিশেষ করে ১২ দিনের যুদ্ধে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর গত ছয় মাসে ইরানকে অস্থিতিশীল করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিল সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোপনে দেশে ঢুকিয়ে ব্যবহার করা। অর্থনৈতিক বিক্ষোভের ভিড়ে এসব অনুপ্রবেশকারী সন্ত্রাসী জনগণের ওপর হামলা চালায়। একই সময়ে সহিংসতা শুরু হয় ইরানের অপসারিত শাহের পুত্র রেজা পাহলভীর আহ্বানের পর, যা ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, অনুপ্রবেশকারী গোষ্ঠীগুলোকে হত্যাকা- ও ধ্বংসযজ্ঞে নামার ইঙ্গিত বহন করত।

যদিও বাজারে পণ্যমূল্য ও সরবরাহের অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভে নামেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়