ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত অন্তত ২০০০
ছবি: সংগৃহীত
ইরানে মুদ্রার রেকর্ড অবমূল্যায়ন ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া জনবিক্ষোভ এখন রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা নজিরবিহীন এই অস্থিরতায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন একজন ইরানি সরকারি কর্মকর্তা।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এই তথ্য জানান।
বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করা হলো।
বার্তা সংস্থাটিকে ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা কর্মী—উভয় পক্ষের মৃত্যুর পেছনেই ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ বিক্ষোভকারী এবং কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তিনি দেননি। মূলত ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর বর্তমান ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর জন্য এই আন্দোলনকে সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান সরকার এই বিক্ষোভকে অর্থনৈতিক কারণে সৃষ্ট ও বৈধ বলে উল্লেখ করার চেষ্টা করলেও, একই সঙ্গে এর কঠোর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই অস্থিরতায় উস্কানি দিচ্ছে এবং নাম না জানা সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের আন্দোলনকে ছিনতাই করেছে।
বিক্ষোভের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যে আরও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা অন্তত ৬৪৫ জন এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ১০ হাজার ৭২১ জনকে। অন্যদিকে, ইরানের একটি বিরোধী সংবাদ মাধ্যম অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছে যে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার পর্যন্ত হতে পারে; যদিও এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সরকারিভাবে কোনো হতাহতের তালিকা প্রকাশ করা না হলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ফুটেজে তেহরানের মর্গগুলোতে কয়েক ডজন লাশের ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যাদের কর্তৃপক্ষ ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
আরও পড়ুন: নিজ নাগরিকদের ‘এ মুহূর্তে’ ইরান ছাড়তে বলল যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সহিংসতাকে জায়েজ করার জন্য বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি দেশটির জনগণের ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের দাবি শোনার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে রাতের অন্ধকারে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ, গোলাগুলি এবং গাড়ি ও ভবনে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য দেখা গেছে।
এদিকে ইরানের এই পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
ইতোমধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগন থেকে ট্রাম্পকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সাইবার অভিযান এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার মতো বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইরান সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
এর বিপরীতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী হলেও যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় বা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
উল্লেখ্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতনের প্রতিবাদে গত ২৮ জানুয়ারি তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা এই আন্দোলন শুরু করেন। যা মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পুরো দেশজুড়ে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








