জুয়া-মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ কঠোর
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৮ বছরের রাজনৈতিক নির্বাসন ও তীব্র গণআন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ সকল বেসরকারি গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, সরকারের কর্মপরিকল্পনা এবং জননিরাপত্তা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ফ্যাসিবাদের পতন পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল শাসনকাঠামো সংস্কার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়কার দুর্নীতি ও দুঃশাসনে পর্যুদস্ত এক ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসনকাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা জোরজবরদস্তি নয় আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার চূড়ান্ত ভিত্তি। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিধিবদ্ধ নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নবগঠিত সরকারকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি সবার অধিকার সমান এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলমত, ধর্ম, দর্শন যার যার রাষ্ট্র সবার। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ে বা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর।
সারা দেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি জানান, এসব নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। জনজীবনে স্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
পবিত্র রমজান উপলক্ষ্যে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস; এ মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কোনো কারণ নেই। ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রমজানকে অধিক মুনাফার মাস হিসেবে বিবেচনা না করে দ্রব্যমূল্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আরও পড়ুন: রমজানে জনভোগান্তি রোধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা
একই সঙ্গে তিনি বলেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এবং অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
রমজানে ইফতার, তারাবিহ ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। অপচয় রোধ ও কৃচ্ছ্রসাধনকে তিনি ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে অফিস-আদালতে অপ্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানান।
সরকারি ব্যয়ে সংযমের দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দল থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সরকারি সুবিধা নিয়ে করমুক্ত গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধাও নেবেন না। তিনি দাবি করেন, এটি ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণেরই প্রতিফলন।
রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে যানজটকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষ নিজ জেলা বা নিজ বাসস্থান থেকে সহজে অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারে সে লক্ষ্যে সারাদেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয়ের কাজ চলছে বলে জানান তিনি। রেলব্যবস্থাকে সহজ, সুলভ ও নিরাপদ করা গেলে শহরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে এবং পরিবেশের উন্নতিও ঘটবে বলে তিনি মত দেন।
তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে তা জনসম্পদে পরিণত হবে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জ্ঞান ও দক্ষতায় নিজেদের পারদর্শী করে তুলতে হবে। কর্মসংস্থান ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়েই সরকার যাত্রা শুরু করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি দেশ ও জনগণের জন্য একটি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে সেই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়। জনগণ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে এবং তা সম্পন্ন করতে সবার অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করেন তিনি।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী আল্লাহর কাছে দেশের শান্তি, সুস্থতা ও উন্নতির জন্য দোয়া কামনা করেন এবং পবিত্র রমজানের প্রাক্কালে দেশবাসীর কল্যাণ কামনা করে বক্তব্য শেষ করেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








