‘হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’, ড. ইউনূসের বিদায়ী ভাষণ
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের সমাপ্তি টেনে জাতির কাছে নিজের কাজের খতিয়ান তুলে ধরে বিদায় নিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে তিনি এই বিদায় বার্তা ঘোষণা করেন।
বিদায়ী ভাষণে তিনি জানান, একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিতে উপস্থিত হয়েছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের আমন্ত্রণে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকারের তত্ত্বাবধানে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
মঙ্গলবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা এর মধ্য দিয়েই তার দেড় বছরের দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
বিদায়ী ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
তার ভাষায়, জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ড. ইউনূস জানান, বিগত ১৮ মাস আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন শেষে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আজ আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি।
বিদায়ের দিনে তিনি ৫ আগস্টের কথা স্মরণ করে বলেন, সেটি ছিল “মহামুক্তির দিন” যেদিন তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশকে দৈত্যের গ্রাস থেকে বের করে এনেছিল। তবে সেই সময় দেশ ছিল সম্পূর্ণ অচল, আর সেটিকে সচল করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত ভেঙে পড়েছিল। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত তারাই দেশের এই যন্ত্র চালাতো। অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বড় কর্তা পালিয়েছে, মাঝারি কর্তা পালিয়েছে, অন্যরা ভোল পাল্টিয়েছে অথবা আত্মগোপনে চলে গেছে। সরকারের ভেতরে কাকে বিশ্বাস করা হবে আর কাকে নয় তা এক মহাসংকট হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে তাকে বিদেশ থেকে দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানানো হয়। শুরুতে রাজি না হলেও জাতির প্রতি কর্তব্যের কথা বলে তাকে রাজি করানো হয়।
১৮ মাস পর এখন আমার যাওয়ার পালা। আমি আজ আমার কাজ হতে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি, বলেন তিনি।
ভাষণে তিনি আরও বলেন, জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের সময় দেশ গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, গণতন্ত্র ধুলিস্যাৎ হয়েছিল এবং ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। সেই পরিস্থিতিতে দেশকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য তাকে তিনটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদে এনসিপির স্বাক্ষর, ধন্যবাদ জানালেন প্রধান উপদেষ্টা
আমি ও আমার সহকর্মীরা সেই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গেছি। কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি- সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকলো, বলেন ড. ইউনূস।
তিনি দাবি করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে এবং ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক সংস্কারে হাত দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।
তার মতে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা—“নতুন বাংলাদেশের জন্ম।”
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও সর্বসম্মত জুলাই সনদের ওপর গণভোটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেড় যুগ পর অনুষ্ঠিত এই ভোটে দেশের সর্বত্র ঈদের আমেজ বিরাজ করেছিল, যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এই নির্বাচনে জয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষকেই অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।” যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন, আর যারা জয়ী হতে পারেননি তারাও প্রায় অর্ধেক ভোটারের আস্থা অর্জন করেছেন এ কথা জেনে সবাই আশ্বস্ত হতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. ইউনূস আরও বলেন, এই অর্জনের পেছনে যারা ছিলেন জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে আসা প্রতিবাদকারী তরুণ-তরুণীরা, শহীদ ও আহতরা তাদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রশাসনের সব স্তরের সদস্যদের সহযোগিতার কথাও তিনি স্মরণ করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, নতুন সরকার আগামীকাল দায়িত্ব গ্রহণ করবে, আর এর মধ্য দিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের পথচলার সমাপ্তি হবে। নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এই ভাষণের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিক বিদায়ের বার্তা দিলেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








