নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৪৭, ৩০ জুন ২০২৬

মানবতাবিরোধী অপরাধে ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

মানবতাবিরোধী অপরাধে ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যাকাণ্ড ও উসকানির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। 

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। 

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এই রায়ে আসামিকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি মোট দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি টেনে রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনু। মামলার নথি ও প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল। দীর্ঘ বিচার-বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। 

রায় প্রদানকালে ট্রাইব্যুনাল জানান, ৩ নম্বর অভিযোগে রাইসুল হকসহ ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নির্যাতনের দায়ে, ৬ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার দায়ে এবং ৭ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ততার দায়ে তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে। 

রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, আসামির ওপর আরোপিত সকল সাজা যুগপৎ কার্যকর হবে, অর্থাৎ তাকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে। এছাড়া ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগের সপক্ষে অপরাধ সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস প্রদান করেছেন।

আরও পড়ুন: রামপুরা হত্যা মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনারসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ এবং একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রসিকিউশন কর্তৃক আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের পর গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকার্য শুরু হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন এবং আসামিপক্ষ থেকে দুইজন সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কাজ শুরু হয়, যা ১৪ মে সম্পন্ন হয়। এরপরই ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন এবং ২২ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।

প্রসিকিউশনের আনা আটটি অভিযোগের মূল উপজীব্য ছিল জুলাই অভ্যুত্থান দমনে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত কঠোর অবস্থানের সঙ্গে ইনুর সম্পৃক্ততা। অভিযোগগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লিখিত ছিল ১৮ জুলাই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মিরর নাউ-এ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের সভায় ছাত্র-জনতা দমনে শ্যুট অ্যাট সাইট বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা। 

এছাড়া ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের তালিকা প্রণয়ন ও তাদের দমনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যার সরাসরি প্রতিফলন ঘটে ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে। সেদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ১৪ দলীয় জোটের ক্যাডারদের গুলিতে আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, বাবলু ফরাজী ও ইউসুফ শেখ নামক ছয়জন নিহত হন।

রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হাসানুল হক ইনু এটিকে ফরমায়েশি রায় ও প্রহসনের বিচার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, এই রায়ের বিরুদ্ধে আগামী এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে জাসদ সভাপতির। 

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তারের পর থেকে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল, যার মধ্যে কুষ্টিয়ার এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি অন্যতম। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে মোট ৮৭টি মামলা চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ। ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণকারী এবং বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ইনুর এই দণ্ডাদেশ জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়