নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:৪১, ২৮ জুন ২০২৬

রামপুরা হত্যা মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনারসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

রামপুরা হত্যা মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনারসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি বীভৎস ঘটনার বিচারিক রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। 

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ রবিবার (২৮ জুন) এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করেন। 

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ঘোষিত রায়ে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড এবং অপর দুজনের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারিক প্যানেলের রায় অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। রায় ঘোষণার সময় এই তিন আসামি পলাতক ছিলেন। 

এ ছাড়া রামপুরা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার বর্তমানে কারাগারে আটক থাকলেও এসআই তারিকুল পলাতক রয়েছেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে আত্মরক্ষার জন্য আশ্রয় নেন আমির হোসেন নামের এক তরুণ। পুলিশ তাকে ধাওয়া করলে প্রাণ বাঁচাতে তিনি ভবনের ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন। এমন অসহায় অবস্থায় থাকাকালীন পুলিশ সদস্য চঞ্চল চন্দ্র সরকার তার ওপর ছয় রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেন। ভাগ্যক্রমে ওই তরুণ বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন। একই দিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের নির্বিচার গুলিতে নাদিম এবং মায়া ইসলাম নামের দুইজন নিহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। প্রসিকিউশন পক্ষ শুরু থেকেই আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

আরও পড়ুন: আদালতে প্রক্সি দিতে আটক নারী, পালালেন আইনজীবীরা

বিচারিক কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, রায় ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল অনুমতি প্রদান করেন। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে জনগণ সরাসরি বিচারিক স্বচ্ছতা প্রত্যক্ষ করতে পারেন। বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে রায় পড়া শুরু হয় এবং দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের প্রাক্কালে প্রসিকিউশন এবং আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের নানা ধাপ পার হতে হয়েছে। গত বছরের ৩১ জুলাই ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করার পর ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শেষে ২৩ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়, যা চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি শেষ হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল।

রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এই মামলার রায় ন্যায়বিচারের প্রতিফলন এবং এটি যথাযথ হয়েছে। 

উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর মধ্যে এটি পঞ্চম রায়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ইতিপূর্বেও চানখাঁরপুলের অপর একটি মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। 
রায়ের মাধ্যমে জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। ট্রাইব্যুনালের এই রায় দেশের বিচারিক ইতিহাসে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়