News Bangladesh

জাফর আলম, কক্সবাজার থেকে || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:১০, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
আপডেট: ১৬:৩১, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

ঘুষের টাকা যাচ্ছে ডিএফও`র পকেটেও,  বনভূমির ‘রক্ষকই ভক্ষক’

ঘুষের টাকা যাচ্ছে ডিএফও`র পকেটেও,  বনভূমির ‘রক্ষকই ভক্ষক’

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের আওতাধীন রাজারকুল রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্বিচারে চলছে গাছ নিধন ও বনভূমি দখল। সেই সাথে প্রকাশ্যে গাছ পাচারের ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও বনায়ন নিয়ে চলেছে হরিলুট। বনভুমি বিক্রি ও পাহাড় কেটে পাকা দালান নির্মাণে সহযোগিতা করে আর্থিক লাভবান হয়েছে খোদ রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান। 

রাজারকুল রেঞ্জের আওতাধীন চার বিট রাজারকুল, আপাররেজু, দাড়িয়ারদীঘি, পাগলিরবিল বিট। রাজারকুল রেঞ্জের আওতাধীন এলাকাগুলোতে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বনভুমি বিক্রি ও মূল্যবান গাছ কেটে পাচারের ঘটনা রীতিমতো পরিবেশবাদী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এতে লাভবান হচ্ছে রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান, আপাররেজু বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ ও দাড়িয়ারদীঘি বিট কর্মকর্তা শিহাব। 

এদিকে, রেঞ্জ ও বিট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দিন-রাত গাছ কাটা এবং কাঠ পাচার অব্যাহত থাকলেও সংশ্লিষ্টরা রহস্যজনক নিরবতা পালন করছেন বলে অভিযোগ। রেঞ্জ কর্মকর্তার নিরব ভুমিকার কারণে কাঠ চোরেরা আস্কারা পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে গাছ নিধনে মেতে উঠেছে। 

স্থানীয় পরিবেশ প্রেমিরা জানান, সেখানে সবুজ প্রাকৃতিক বিভিন্ন মূল্যবান গাছপালা এবং পাহাড় কেটে চাষের জমি তৈরি করা হয়েছে। এভাবে পাহাড় কাটা, বনভূমি দখল করায় পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে পরিবেশ প্রেমিরা মনে করেন। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে থোয়াইংগাকাটা বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন হাতির ডেবা এলাকার বাসিন্দা প্রতিবন্ধী বাবুল এবং রমজান আলী। এ সময় রাজারকুল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান ও আপাররেজু বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ একটি সরকারি গাড়িতে করে সেখানে আসেন। গভীর রাতে দুই যুবককে তুলে নিয়ে গিয়ে বনবিভাগের একটি বিট অফিসে সারারাত আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। 

ভুক্তভোগীরা বলেন, আমরা চায়ের দোকানে বসে কথা বলছিলাম। হঠাৎ করে তারা এসে আমাদের যেতে বলে। আমরা কারণ জানতে চাইলে অস্ত্র দেখিয়ে জোর করে তুলে নেয়। পরে একটি জরাজীর্ণ কক্ষে সারারাত আটকে রাখা হয়। সকালে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। 

বন থেকে অবৈধ ভাবে কেটে নেওয়া কাঠ

ভুক্তভোগী বাবুল শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং আতঙ্কে রয়েছেন। খোদ রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান ও  বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ এবং শিহাবের সাথে বনভূমি অবৈধ দখলদাররা যোগসাজশে এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে অভিযোগ।

আরও পড়ুন: ২ বছর অনুপস্থিত থেকেও অধ্যক্ষ পদের বেতন পাচ্ছেন পলাতক আ.লীগ নেতা

আপাররেজু বিট কর্মকর্তা ফুয়াদ ও দাড়িয়ারদীঘি বিট কর্মকর্তা শিহাব যোগদানের পর থেকেই শুরু হয় বেপরোয়া গতিতে চলছে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, বনভূমি অবৈধ দখল। রেঞ্জ ও বিট কর্মকর্তাদের সাথে বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠে শীর্ষ পাহাড়খেকোদের সাথে। নতুন করে আর কোন মামলা না হওয়ার বিশেষ গোপন চুক্তিতে পাহাড় কাটার ‘লাইন’দেন বনভূমি অবৈধ দখলদার সিন্ডিকেটকে। এভাবে পাহাড় এবং বনের গাছ কাটলে খুব অচিরেই কক্সবাজারের বনভুমি ধ্বংস হবে বলে মনে করেন সচেতন মহল। 

রাজারকুল রেঞ্জের আওতাধীন বনভূমিতে স্থাপিত প্রতিটি পানের বরজ মালিকদের কাছে থেকে মোটা অংকের টাকা যায় রেঞ্জ কর্মকর্তার পকেটে। নতুন করে কেউ যদি পানের বরজ করতে চাই তাকেও গুনতে হয় মোটা টাকা। যদি না দেয়া হয় তাহলে চলে উচ্ছেদের নামে তাণ্ডব। মোটকথা ওই রেঞ্জের বনভূমিতে কোনপ্রকার স্থাপনা করতে গেলে কর্তা বাবুকে দিতে মোটা অংকের টাকা। 

অভিযোগ উঠেছে, গত ১৪ জানুয়ারি রাতে রাজারকুল ও উখিয়া রেঞ্জ যৌথ অভিযানে রাজারকুল রেঞ্জের আপাররেজু বিটের থোয়াইঙ্গাকাটা নামক স্থান থেকে একটি ডাম্পার পাহাড় থেকে মাটি কাটা অবস্থান জব্দ করে রাজারকুল রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান। জব্দকৃত ডাম্পার গাড়িটি রেঞ্জে ছিল। দীর্ঘ দেড় মাস পর মোটা অংকের লেনদেন করে রাতের আঁধারে ডাম্পারটি ছেড়ে দিয়েছেন। সরকারি বনভূমি, বন্যপ্রাণী ও বনায়ন রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান রক্ষক না হয়ে ভক্ষকের ভুমিকা পালন করছেন। 

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সব বিষয় ডিএফও স্যার জানেন। 

স্থানীয়রা জানান, চোরাই কাঠ পাচারকারী চক্র বনের মূল্যবান গাছ কেটে অন্যত্র পাচার করে দিচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করলেও কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের রাজারকুল রেঞ্জ  কর্মকর্তা এব্যাপারে নিরব ভুমিকা পালন করছেন। 
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বনাঞ্চলের মুল্যবান গাছ কেটে পাচার সহজতর এবং দ্রুত অন্যত্র পাচারের জন্য সংরক্ষিত বনের ভেতর গাছ ও পাহাড় কাটছে কাঠ পাচারকারী ও বনভূমি দখলদাররা। কাঠ চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের সাথে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে কাঠ ও পাহাড়ি পাথর পাচার করে পকেট ভারি করছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা। নির্বিঘ্নে ডাম্পার যোগে দিনে ও রাতে কাঠ পাচার করা হচ্ছে বনের মূল্যবান কাঠ। অবৈধ দখলদারের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে দালান নির্মাণে সহযোগিতাও করেছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা।

রাজারকুল প্রতিটি অবৈধ কাঁচা পাকা দালান থেকে তিনি লাখ লাখ টাকা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বনজায়গীরদার (ভিলেজার) জানান, বিভিন্ন পয়েন্টে দিনে ও রাতে গাছ কাটা যাচ্ছে। এমনকি মুল্যবান গাছ ছাড়াও বনাঞ্চল থেকে লাকড়ি যাচ্ছে রামুর এলাকার বিভিন্ন ইট ভাটায়। রেঞ্জে প্রতিনিয়ত গাছ নিধন করেছে কাঠ চোরেরা। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন বন কর্মকর্তারা এসব এলাকা পরিদর্শন করলে শতশত সদ্যকাটা গাছের মুথা পাওয়া যাবে। রেঞ্জ কর্মকর্তা মাঝে মধ্যে টহলে গিয়ে গাছ নিধন দৃশ্য দেখেও এড়িয়ে যান। 

কারণ হিসেবে তারা বলেন, প্রতিটি নিধন হওয়া গাছের টাকা পান রেঞ্জ কর্মকর্তা। অথচ উক্ত বনাঞ্চলে এসব গাছ বড় করতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গাছ বড় করতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। অথচ বনের রক্ষক রেঞ্জ কর্মকর্তা কাঠ চোরদের সাথে আঁতাত করে তিনি নিজেই এখন ভক্ষকে পরিণত হয়েছেন। এসব গাছ অতিঅল্প সময়ে মোটা টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছেন তিনি। 

এবিষয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনকে একাধিকবার কল দিয়েও রিসিভ না করায় তান কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়