জ্বালানির ধাক্কায় লাগামহীন মূল্যস্ফীতি
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আরও প্রকট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদন এবং পরিবহনসহ প্রতিটি স্তরে ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, নিকট ভবিষ্যতে এই মূল্যস্ফীতির চাপ কমার বদলে আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির সরবরাহ সংকট এবং বৈশ্বিক বাজারের উচ্চমূল্যের কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে মার্চ মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এলেও সামগ্রিক চাপ উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, এই সময়ে বিশেষভাবে জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ছে।
আরও পড়ুন: বৈশ্বিক সংকট ও জ্বালানি চাপে ৯ লাখ কোটির বাজেট প্রস্তুতি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং তা সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত ব্যয় চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে এবং সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও গভীর হয়।
প্রতিবেদনে খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে সবজি ও মসলা জাতীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, পাশাপাশি মাংস, মাছ ও ডিমের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্যের মূল্যও মূল্যস্ফীতির বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধির ফলে পোশাক ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্য এবং দেশীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে অবদান আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে আমদানিনির্ভর অখাদ্য পণ্যের ক্ষেত্রে এই চাপ কিছুটা কমেছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় সামান্য কম থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সীমিতভাবে হলেও হ্রাস পেয়েছে। মার্চে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতিতে তাৎক্ষণিক ধাক্কা তৈরি করে, তবে সময়ের সঙ্গে বাজার স্থিতিশীল হলে চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে জ্বালানি যেহেতু প্রায় সব খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, তাই এর মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির সামগ্রিক কাঠামোতেই প্রভাব ফেলে বলে তারা মত দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নীতিগতভাবে আরও সতর্ক ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানি খাতের মূল্যচাপ কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা না গেলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








