কালবৈশাখীর তাণ্ডবে মাঠেই গলে গেল ৫০ হাজার লবণচাষীর স্বপ্ন
ছবি: সংগৃহীত
মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড় ও অতিবৃষ্টিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলের বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে বিষাদে রূপ নিয়েছে চাষিদের সারা বছরের পরিশ্রম। মাঠের উৎপাদিত লবণ বৃষ্টির পানিতে মিশে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা বিশেষ স্তরের ‘বেড’ বা ‘কাই’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন থমকে গেছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারমূল্য কম থাকায় প্রান্তিক চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হাহাকার। এই বিপর্যয়ে টেকনাফ অঞ্চলের লবণ উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এখন গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং স্থানীয় চাষিদের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহের শেষ তিন দিনে টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছড়া, সাবরাং এবং শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর লবণ উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যার ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে সেই লবণের স্তূপ মাঠেই গলে যায়।
শাহপরীর দ্বীপের লবণচাষি নুরুল ইসলাম ও সাবরাংয়ের আলী আহমদের ভাষ্যমতে, এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশ মণ লবণ নষ্ট হয়েছে। লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় মাঠ নতুন করে প্রস্তুত করতে অন্তত সাত থেকে ১০ দিন সময় লাগবে। কিন্তু মৌসুমের একেবারে শেষ সময়ে এসে এই দীর্ঘ বিরতি লবণ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে) কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় মোট ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে। বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন কম। গত মৌসুমে এই সময় পর্যন্ত উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ টন। চলতি বছর দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টন নির্ধারণ করে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার টন। তবে দফায় দফায় বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন অনেকটাই অনিশ্চিত।
আরও পড়ুন: বানের জলে মিশে গেল কৃষকের ঘাম ও স্বপ্ন
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি চাষিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে অসম বাজারমূল্যের কারণে।
নয়াপাড়ার চাষি গিয়াস উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বর্তমানে এক মণ লবণ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকা, অথচ বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায়। প্রতি মণে ৪০-৫০ টাকা লোকসান দিয়ে চাষিরা এখন ঋণের জালে আটকা পড়েছেন।
টেকনাফ সাবরাং লবণচাষী কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমদের মতে, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার নেপথ্যে একটি ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে। এই অসাধু চক্রটি লবণের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে আমদানির পাঁয়তারা করছে, যা কার্যকর হলে দেশীয় প্রান্তিক চাষিরা স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
বিসিকের কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে আমরা শঙ্কিত। বর্তমানে মাঠ ও মিল পর্যায়ে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার টন লবণের মজুদ থাকলেও উৎপাদন ব্যাহত হলে সরবরাহ চেইনে প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, টেকনাফ লবণ কেন্দ্রের প্রধান মিজানুর রহমান জানান, টেকনাফে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৫০ একর জমিতে ১ লাখ ৩৫ হাজার টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এবং চাষিরা মাঠে ফিরতে না পারলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বাড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লবণ শিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকারি প্রণোদনা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন উপকূলের হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








