প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডে কাঁপছে রাজধানী, সক্রিয় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক নাজুক চিত্র ফুটে উঠছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, কুপিয়ে খুন, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা যেন ফের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
গত কয়েক মাসে কারাগার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন সমীকরণ এবং পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক খুনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধের গ্রাফ এখন ঊর্ধ্বমুখী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যান, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরুত্থান, বিদেশে অবস্থান করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সক্রিয় নেটওয়ার্ক সব মিলিয়ে অপরাধ পরিস্থিতি নতুন করে জটিল আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, জনসমাগমের মধ্যেই টার্গেট কিলিং এবং অপরাধীদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার একাধিক ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট। ২০২৩ সালে সারা দেশে হত্যা মামলা ছিল ৩,০২৩টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৪৪২টিতে এবং পরবর্তী বছরে তা আরও বেড়ে ৩,৭৮৬টিতে পৌঁছায়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি।
একই সময়ে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি হত্যার ঘটনা ঘটে জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং মার্চে ৩৩টি। এপ্রিলের প্রথমার্ধেই অন্তত ১৬টি এবং মাসের শেষভাগ পর্যন্ত মোট খুনের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শুধু প্রথম তিন মাসেই রাজধানীতে ৬১টি হত্যার আলাদা হিসাবও পাওয়া গেছে, যা তথ্যভিত্তিক পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক প্রবণতা খুনের ঊর্ধ্বগতি একই চিত্র তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, হামলাকারী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পেছন থেকে গুলি করে, পরে কাছে গিয়ে একাধিকবার গুলি চালিয়ে মাথায় চূড়ান্ত শট দিয়ে নিশ্চিত করে মৃত্যু। জনাকীর্ণ সড়কে এমন ঘটনার সময় আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু হয়। একই ধরনের ঘটনা গত বছর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সামনে এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলেও ঘটেছে, যেখানে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা বা সফল হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীদের গ্রেফতার বা বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি দৃশ্যমান না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আরও পড়ুন: ঘুষের টাকা যাচ্ছে ডিএফও`র পকেটেও, বনভূমির ‘রক্ষকই ভক্ষক’
রাজধানীর বাইরে রাঙামাটিতে সশস্ত্র হামলায় ধর্মশিং চাকমা নিহত হওয়া, কুষ্টিয়ায় পীরকে পিটিয়ে হত্যা, মিরপুরে শিশুহত্যা এবং পল্লবীতে প্রবীণ শিক্ষিকাকে হত্যা এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা মিলিয়ে বোঝা যায়, সহিংস অপরাধ শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, বরং দেশব্যাপী বিস্তৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির ঘটনাও বাড়ছে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি অংশ পুরোনো প্রভাব পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুসহ বেশ কয়েকজনের নাম ঘুরে ফিরে আসছে। এদের কেউ কেউ আবার বিদেশে অবস্থান করেও মোবাইল ফোন ও অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং কন্ট্রাক্ট কিলিং পরিচালনা করছে। দুবাই, থাইল্যান্ড, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ‘বড় ভাই’ পরিচয়ে ফোন করে ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। এমন অভিযোগ একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধী নেটওয়ার্কের বিভাজনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, হাজারীবাগ ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় ইমন ও পিচ্চি হেলালের গ্রুপের দ্বন্দ্ব; মিরপুর-পল্লবী-কাফরুল অঞ্চলে কিলার আব্বাস ও ইব্রাহিম খলিলদের তৎপরতা; ফার্মগেট-কাওরানবাজারে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে সংঘবদ্ধ গ্রুপের প্রতিযোগিতা এসব মিলিয়ে রাজধানী কার্যত একাধিক অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণক্ষেত্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বাজার, ফুটপাত, পরিবহন স্ট্যান্ড ও সরকারি দপ্তরের টেন্ডার সবখানেই চাঁদাবাজির বিস্তৃতি ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদা আদায়ের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের তালিকা তৈরি করে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ব্লক রেইডসহ বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার, বিচার ও নেটওয়ার্ক ভাঙার ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা বা অপারেশনাল দ্বিধা থাকলে অপরাধীরা সেই সুযোগ নেয় যার প্রতিফলন বর্তমানে দেখা যাচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা বা সহিংসতার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে ভয়, হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা এমনকি জনরোষেও রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে এসব দৃশ্য অপরাধপ্রবণতাকেও পরোক্ষভাবে উসকে দিতে পারে বলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, দেশে অপরাধ পরিস্থিতি এখন একটি ‘ট্রানজিশনাল ফেজ’-এ রয়েছে, যেখানে পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঠামো ভেঙে নতুন করে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস চলছে। এই পর্যায়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা নজরদারি, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পলাতক অপরাধী গ্রেফতার এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এসব ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। অন্যথায় রাজধানীসহ সারা দেশে সহিংস অপরাধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








