News Bangladesh

হাসানুজ্জামান হাসান, লালমনিরহাট থেকে || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৫৪, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
আপডেট: ১৪:৫৭, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

২ বছর অনুপস্থিত থেকেও অধ্যক্ষ পদের বেতন পাচ্ছেন পলাতক আ.লীগ নেতা

২ বছর অনুপস্থিত থেকেও অধ্যক্ষ পদের বেতন পাচ্ছেন পলাতক আ.লীগ নেতা

অধ্যক্ষ ও আওয়ামী লীগ নেতা শরওয়ার আলম। ছবি: নিউজবাংলাদেশ

টানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও অধ্যক্ষ পদে বেতন ভাতা পাচ্ছেন পলাতক লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক শরওয়ার আলম। তিনি আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ হলেও গত ২০২৪ সালে হাসিনা বিরোধী জুলাই আন্দোলন শুরু হলে প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করেন তিনি। আজ অবধি প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতায় তিনি অনুপস্থিত আছেন। তবে এই দুই বছর অনুপস্থিত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদারের অনুমোদনে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন শরওয়ার আলম।

অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনটিতে তৃতীয় বিভাগ নিয়েও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে গত ১৯৯৭ সালের ১৮ অক্টোবর নিয়োগ পান আওয়ামী লীগ নেতা শরওয়ার আলম। পরবর্তিতে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ প্রায় শহিদুর রহমান অবসর গ্রহণ করলে দলীয় প্রভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর ক্ষমতার দাপটে আগের পদে ইস্তেফা না দিয়ে ১২ বছরের স্থানে মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন দাপুটে এ নেতা। শিক্ষক অভিভাবকসহ স্থানীয়রা তার জাল জালিয়াতির প্রমাণসহ অভিযোগ করেও টলাতে পারেননি। দলীয় প্রভাবে প্রতিষ্ঠানের নামে লাখ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্ধ নিয়ে আত্নসাৎ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফ্যাসিস আওয়ামী লীগ হঠাও আন্দোলন শুরু হলে প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত বন্ধ করেন তিনি। যা আজ অবধি প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত আছেন। এভাবে টানা প্রায় দুই বছর প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেও বেতন ভাতাদি পাচ্ছেন জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি দাপুটে এ অধ্যক্ষ। যা নিয়ে নানান সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। 

গত ২৪ সালের ২৮ আগস্ট তার নিয়োগের জাল জালিয়াতি নিয়ে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেন শিক্ষক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় অভিভাবকরা। অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) নুর ই আলম সিদ্দিকী তাকে খোরাকি দিয়ে গত ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সাময়িক বরখাস্থ করেন। এ আদেশ স্বাভাবিকভাবে ৩ মাস পরে বাতিল হলে সম্পূর্ণ বেতন পাচ্ছেন তিনি। তবে অভিযোগ উঠেছে, বেতনের একটি বড় অংশ কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিয়ে অনুস্থিত অধ্যক্ষ বেতন ভাতা নিচ্ছেন।  

আরও পড়ুন: ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে ঐতিহাসিক কাকিনা জমিদারবাড়ি

তার অনুপস্থিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন। প্রতিষ্ঠানের ৭ বছর অনুপস্থিত সমাজকর্মের সহকারী অধ্যাপক ৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামী (বর্তমানে গ্রেপ্তার) আবু হেনা মোস্তফা জামানকে বেতন ভাতা প্রদান, প্রতিষ্ঠানের ইট খোয়া নিজের বাড়িতে পাচার, প্রতিষ্ঠানে ফ্যান চুরি মামলা আপোষের নামে চোরের কাছ থেকে অর্ধ লাখ টাকা আত্নসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিতসহ নানান অভিযোগ উঠে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।

অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম প্রতিষ্ঠানে দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও বেতন ভাতাসহ সকল সুবিধা ভোগ করায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক কর্মচারীরা অনেকেই অনিয়মিত। যার কারণে ঐতিহ্যবাহি এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ মুখ থুবড়ে পড়ছে। পরিবেশ ফেরাতে কঠোর নজরদারিসহ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ স্থানীয়দের।

শিক্ষার্থী মাজেদুল বলেন, অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম জুলাই আন্দোলন থেকে প্রতিষ্ঠানে আসেন না। পুকুর পাড় নির্মাণের নামে ১৩ লাখ টাকা আত্নসাৎ করে পালিয়েছেন। তিনি না এসে বেতন পাওয়ায় বাকি শিক্ষকদের অনেকেই না এসে বেতন তুলতে শুরু করেছেন। এখন দু'একটি ক্লাস ছাড়া ক্লাস হচ্ছে না। 

অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ না এসে বেতন পাচ্ছেন আর একজন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পেয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিত্যাক্ত ভবনের বারান্দার ইট খোয়া বাড়িতে নিয়েছেন। চুরির মামলা আপোষের নামে টাকা নিয়ে আত্নসাৎ করেছেন। সবাই আত্নসাৎ নিয়ে ব্যস্ত, পড়ালেখার দিকে কারও নজর নেই। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি নষ্টের দ্বার প্রান্তে।

প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যালয় শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভার.) তমিজার রহমান বলেন, অধ্যক্ষ স্যার জুলাই আন্দোলন শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। অন্য প্রতিষ্ঠানে মব সৃষ্টি হলেও এখানে এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি। তবে শুনেছি, তদন্ত কমিটি তার নিয়োগ জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় লজ্জায় ও ভয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানে আসেন না। তার সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ নেই। আমরা জানি না, তিনি জীবিত না মৃত। 

কলেজ শাখার সহকারী অধ্যাপক এটিএম আতাউর রহমান বলেন, আওয়ামী ক্ষমতার দাফটে জালজালিয়াতি করে প্রভাষক ও পরে ইস্তোফা না দিয়ে ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় অধ্যক্ষ পদে বাগিয়ে নেন শরওয়ার আলম। টানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও রহস্যজনকভাবে বেতন বাতা পাচ্ছেন তিনি। তাকে দেখে অনেকেই এখন এ প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত। যে যার মত আসেন আর চলে যান। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শুনেছি, পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের চেষ্টা করছেন। 

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ইউএনও স্যার প্রতিষ্ঠানের সভাপতি তার নির্দেশে অনুপস্থিত অধ্যক্ষ শরওয়ার আলমকে বেতন ভাতা দিতে হচ্ছে। তিনি প্রতিষ্ঠানে না এসেও বেতন পাবেন আর আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব কেন পালন করব? সরকার তাকে যেহেতু বেতন দিচ্ছে তো তাকে কর্মস্থলে ফেরালেই হয়। আমারও ইচ্ছে নেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে। আমি যে পদে বেতন ভোগ করি সেপদে ক্লাস নিয়ে চলে যাব। তবে তিনি তার অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। 

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতন ভাতার সিট প্রস্তুত করে দেন আমি অনুমোদন করি মাত্র। এতে কোন ধরনের লেনদেনের সুযোগ নেই। তিনি যদি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে পালনে অনিচ্ছুক হন তবে লিখিত জানালে আমরা অন্য কাউকে দায়িত্ব দিব। পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদান করতে একটা লিখিত আবেদন করেছেন। আমরা তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিব।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়