বটতলায় ‘ডেথ ট্র্যাপ’: মীমাংসার ফাঁদে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনকে হত্যা
খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন (৬০)। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় সরকারঘোষিত এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন (৫৭) হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মোহাম্মদপুরের বসিলা পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মূলত দ্বন্দ্ব মীমাংসার কথা বলে কৌশলে ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
বুধবার (৩০ এপ্রিল) বিকেলে ডিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান।
মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা পৌনে ৮টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন নিউমার্কেটের বটতলা এলাকায় টিটনকে খুব কাছ থেকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্তকারীরা জানান, মোটরসাইকেলে করে মুখে মাস্ক ও মাথায় টুপি পরা চারজন হামলাকারী আগে থেকেই ওত পেতে ছিল। তাদের মধ্যে দুজন সরাসরি গুলি চালায়, আর বাকি দুজন অস্ত্রসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। গুলি চালানোর পর স্থানীয় লোকজন ধাওয়া দিলে সহযোগীদের সহায়তায় তারা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
আরও পড়ুন: নিউমার্কেটে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত যুবক ‘শীর্ষ সন্ত্রসী টিটন’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, দীর্ঘ কারাভোগের পর গত ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান টিটন। এরপর তিনি কোনো অপরাধমূলক কাজে না জড়ালেও আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুরের বসিলা পশুর হাটের ইজারা নেওয়ার জন্য শিডিউল কেনেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগীরা। হেলাল নিজেও কারামুক্ত হওয়ার পর ওই হাটের একক আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া ছিলেন। এই ইজারা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মেটানোর কথা বলে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর টিটনকে নিউমার্কেটের শাহনেওয়াজ হলের সামনের বটতলা এলাকায় ডেকে আনা হয়। সেখানে আগে থেকে ওতপেতে থাকা হেলমেট ও মাস্ক পরিহিত চারজন শুটার টিটনের খুব কাছ থেকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। কিলিং মিশনের সময় দুজন গুলি চালালে বাকি দুজন অস্ত্রসহ মোটরসাইকেলে পাহারায় ছিল। হামলার সমন্বয়ক হিসেবে ‘কাইলা বাদল’-এর নাম উঠে এসেছে। হামলা শেষে বিডিআর ৩ নম্বর গেট দিয়ে পালানোর সময় তাদের সহায়তা করেন শাহজাহান নামের এক সহযোগী।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় ৮-৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, টিটন তাকে আগেই জানিয়েছিলেন যে বসিলা হাটের শিডিউল কেনা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, কাইলা বাদল, ভাঙ্গাড়ি রনি ও শাহজাহানদের সঙ্গে তার ঝামেলা চলছে। গত ২৭ এপ্রিল টিটন তার ভাইকে ফোনে জানান, তারা তাকে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে ডেকেছে এবং তিনি সেখানে যাচ্ছেন। এরপরই তার মৃত্যুর সংবাদ আসে। ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটনের নাম ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের আধিপত্যের জেরে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা এজাহারে নাম আসা আসামিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। যেহেতু সামনে কোরবানি ঈদ, তাই গরুর হাটকে কেন্দ্র করে যেন আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
অপরাধীদের গ্রেফতারে প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে উল্লেখ করে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্তে যাদেরই নাম আসুক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি দেশের বাইরে থেকে কেউ এই হত্যাকাণ্ডে নির্দেশনা দিলে তাদের ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








