আসাদুল হক খোকন, নিউজ এডিটর || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:২৫, ১৩ মে ২০২৬
আপডেট: ১৩:১৭, ১৩ মে ২০২৬

তাশরিক কি ভাইরালই হতে চান নাকি সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন?

তাশরিক কি ভাইরালই হতে চান নাকি সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন?

তাশরিক-ই হাবিব। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক তাশরিক-ই হাবিব। এই কদিন আগেও আমরা তার নাম জানতাম না। এখন তিনি সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়। কিন্তু তার আসল অভিপ্রায় বা অভীপ্সা কী -সেটি দেখতে আরো কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে।

হঠাৎ করেই তাশরিক-ই-হাবিব নিজের সোশ্যালে হ্যান্ডেলে- লাইভে এসে নির্লিপ্ত চোখ এবং ভাবলেশহীনভাবে গান গাইছেন, কবিতা আবৃত্তি করছেন এবং ফলোয়ারদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে বাতচিত করছেন। তার কথা ঠিক থাকলেও সঙ্গীতের তাল লয় সুর কিছুই হচ্ছে না, আবৃত্তির টেম্পু, পজ, স্পেলিং কিছুরই ঠিক ঠিকানা নাই। সে কারণে অসংখ্য মানুষের কাছে সিরফ বিনোদনের খোরাক হচ্ছেন তিনি। কিন্তু তিনি ভাবলেশহীন। এতে ব্যাপকভাবে লোক হাসছে, তাকে নিয়ে ট্রল হচ্ছে, মিম, রিলস, শর্টস বানানো হচ্ছে। এরপরও তিনি ভুলেও হাসছেন না। কমেডিয়ানরা নিজেরা হাসে না -লোক হাসায়-টাইপের চরিত্রে পরিণত করেছেন নিজেকে। 

কিন্তু কেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কেন হঠাৎ করে নিজেকে জোকার হিসেবে দুনিয়াব্যাপী প্রমাণ করার মাঠে নেমে পড়বেন? এসব কি শুধুই কন্টেন্ট? তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চাইছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় যাচ্ছেতাই বিষয়েই মূলত মানুষের আগ্রহ? জ্ঞান বা মেধাভিত্তিক চিন্তা, আলোচনা, গবেষণার কোনো মূল্য নেই? নাকি তার এই ভাড়ামির অভ্যন্তরে ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে?

এর পেছনে তাশরিকের দুটি উদ্দেশ্য থাকার কথা অনুমান করা যায়। 
প্রথমত-

তিনি আজকের বাংলাদেশের সমাজকে বাজিয়ে দেখতে চাইছেন। উচ্ছৃঙ্খল সমাজের উদ্ভট মানুষেরা কী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেটির স্বরূপ সন্ধান করতে গিয়ে নিজেকেই পর্যবেক্ষণের অনুষঙ্গ করে তুলছেন তিনি। যা হয়ত তার পরবর্তী গবেষণার বিষয়।

অর্থাৎ আমাদের সমাজে গভীর কাজের মূল্য কম, দৃশ্যমানতার মূল্য বেশি। একজন গবেষকের ২০ বছরের কাজ যত মানুষ দেখে না, তার ২০ সেকেন্ডের অদ্ভুত ভিডিও তার চেয়ে বেশি মানুষ দেখে। ফলে অনেক বুদ্ধিজীবীও এখন 'মনোযোগ কাড়ার ভাষা' শিখতে বাধ্য হচ্ছেন। তাশরিক হয়তো এ বিষয়য়ে গবেষণা করবেন।

দ্বিতীয়ত
তিনি অন্য সাধারণ কন্টেন্ট ক্রিকেটরের মতোই সস্তা জনপ্রিয়তা ও টাকা উপার্জনের লক্ষ্যে এইসব করছেন। যা হিরো আলম বা তনিরা করে বিখ্যাত হয়েছেন।

একজন শিক্ষকও মানুষ। তিনি গান গাইতে পারেন, লাইভে আসতে পারেন, রসিকতা করতে পারেন, এমনকি আত্মপ্রকাশের জন্য অদ্ভুত পারফরম্যান্সও করতে পারেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের একজন অধ্যাপকের ক্ষেত্রে সমাজ স্বাভাবিকভাবেই একটা বৌদ্ধিক মর্যাদা, সংযম ও রুচির প্রত্যাশা করে। কারণ তিনি শুধু ব্যক্তি নন, একটি জ্ঞান-প্রতিষ্ঠানের প্রতীকও। 

তবে এখানেও একটা জটিলতা আছে। আমরা প্রায়ই 'গম্ভীরতা'কে জ্ঞানের একমাত্র ভাষা মনে করি। ফলে কেউ যদি প্রচলিত অধ্যাপকসুলভ ইমেজ ভাঙেন, মানুষ দ্রুত তাকে 'ভাঁড়' বলে দাগিয়ে দেয়। অথচ ইতিহাসে বহু বুদ্ধিজীবী ইচ্ছাকৃতভাবে কখনও শিল্পীসুলভ প্রকাশ হিসেবে কখনও সমাজের ভণ্ডামিকে ব্যঙ্গ করার মানসে eccentric বা unconventional আচরণ করেছেন।

আবার উল্টো দিকও আছে। যদি কেউ সচেতনভাবে শুধুই ভাইরাল হওয়ার জন্য নিজের বৌদ্ধিক পরিচয়কে সার্কাসে পরিণত করেন, তাহলে সমালোচনা হওয়াটাও স্বাভাবিক। কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে -তিনি কি জ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করছেন, নাকি জনপ্রিয়তার জন্য জ্ঞানকে পণ্য বানাচ্ছেন?

আধুনিক মিডিয়া ইকোসিস্টেমে 'Attention economy'–তে দৃশ্যমান হওয়াটাই প্রথম শর্ত। একজন গবেষক যদি ২০–২৫টা বই লিখেও অদৃশ্য থাকেন, আর এক রাতের অদ্ভুত লাইভে হাজার মানুষ তাকে দেখে -তাহলে তিনি বুঝে যান, জ্ঞান নয়, দৃষ্টি আকর্ষণই মূল মুদ্রা। এখানে 'পাগলামি' আসলে একটা পারফরমেটিভ অ্যাক্ট তথা নিজেকে দৃশ্যমান করার কৌশল।

একটি সুনির্দিষ্ট গভীর গবেষণার জন্য প্রয়োজন সময় ও মনোযোগ। কিন্তু ভাইরাল কনটেন্ট দেয় তাৎক্ষণিক "ডোপামিন"। ফলে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের বদলে, তাৎক্ষণিক উত্তেজনাকে বেছে নেয়। তারা তাৎক্ষণিক উত্তেজনাকেই উপভোগ করতে পছন্দ করেন। 

কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জামাল নজরুল ইসলাম, আল মাহমুদ, রফিকুন্নবী -এরা 'অভিজাত সাংস্কৃতিক পুঁজি'র প্রতিনিধি। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে এই পুঁজির জায়গা দখল করেছে 'attention capital' -যেখানে হিরো আলম বা সালমান মুক্তাদিররা এগিয়ে থাকেন। সস্তা অখাদ্য বিষয়কেই তাতক্ষণিক বিনোদন হিসেবে চোখ বুজে বিনা বিবেচনায় খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। সেক্ষেত্রে জ্ঞান, মেধা ও গবেষণা উপেক্ষিত হবে এটাই স্বাভাবিক। তাতে নিভৃতে প্রকৃত জ্ঞানী, মেধাবী ও গবেষক হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে অদ্ভুত আচরণ করতে পারেন। তাশরিক এই তালিকায় পড়েছেন কিনা সেটি জানতে আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে! 

আরেকটি দিক হলো- মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খোঁজে অন্যের দৃষ্টিতে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই আয়না। ভাইরাল হওয়া মানে -'আমি আছি, আমাকে দেখো।' মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ভাষায় এটা হলো Narcissism বা আত্মমুগ্ধতা। মানুষ কষ্টসাধ্য বৌদ্ধিক আনন্দের চেয়ে সহজ, তাৎক্ষণিক আনন্দ বেছে নেয়। নিজেকে প্রকাশ করার এক ধরনের তাড়না -যা সোশ্যাল মিডিয়ায় বাড়তি উৎসাহ পায়।

আরও পড়ুন: মৌলভীবাজারে পাহাড় টিলা কেটে সাবাড়, কর্তৃপক্ষ নির্বিকার

সেক্ষেত্রে তাশরিক হাবিবের ব্যাপারটি স্ট্র্যাটেজিক ভাইরালিটি তথা সচেতনভাবে নিজেকে আলোচনায় আনা, কিংবা সামাজিক ব্যঙ্গ -সমাজকে আয়না দেখানো বা চপেটাঘাত করা অথবা হতে পারে সত্যিকারের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি -এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি তাইই হয় তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক হাবিবের নৈতিকস্খলনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারণ করে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ তিনি একজন শিক্ষক। তাকে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্ম অনুসরণ করতে পারে। এবং তার দেখানো পথে গিয়ে তাদেরও একই রকম নৈতিক স্খলন হতে পারে- যা তাশরিক হাবিব শিক্ষক হিসেবে করতে পারেন না। একজন শিক্ষক আর সাধারণ মানুষের পার্থক্য আছে!

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়