বাড়তি দামেও ইউরিয়া-টিএপি সার না পাওয়ার অভিযোগ রংপুরের চাষিদের
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
ভরা আমন ধানের মৌসুমে ইউরিয়া ও ডিএপি সার চাহিদামত সরবরাহ পাওয়া গেলেও টিএসপি সার পেতে কৃষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি বাড়তি দর দিয়েও কৃষকরা চাহিদামত টিএসপি সার পাচ্ছেন না। এতে তারা চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে চর ও নদী তীরবর্তী এলাকার কৃষকদের বাড়তি দরে কিনতে হচ্ছে ইউরিয়া ও টিএপি সার।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার বনগ্রাম এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম। তিনি আট বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান লাগিয়েছেন। ধানখেতে ছিটানোর জন্য তার ১০০ কেজি টিএসপি সারের প্রয়োজন। কিন্তু তিনি ছয়টি সার বিক্রয়ের দোকান ঘুরে মাত্র ৪৫ কেজি টিএসপি সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তারমধ্যে ১৫ কেজি সার কিনেছেন সরকার নির্ধারিত ২৭ টাকা কেজি দরে। বাকি ৩০ কেজি কিনতে প্রতি কেজিতে তাকে ৩-৪ টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে।
নজরুল ইসলাম বলেন, ধান গাছে শিকড় শক্ত ও গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য টিএসপি সারের প্রয়োজন। কিন্ত তিনি চাহিদা মতো সার সংগ্রহ করতে না পারায় চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবে ইউরিয়া ও ডিএপি সার সরবরাহ চাহিদামত রয়েছে। চাহিদা মতো টিএসপি সার ধান খেতে ছিটাতে না পারলে আমনের আশানুরুপ ফলন পাওয়া যাবে না। টিএসপি সারের এতটাই সঙ্কট দেখা দিয়েছে যে বাড়তি টাকা দিয়েও এ সার সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।
রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গ্রামের কৃষকরা এখন খেতে আমন ধানের চারা রোপনে ব্যস্ত। অনেক কৃষক দুই সপ্তাহ আগেই চারা রোপন শেষ করেছেন।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৈলমারী এলাকার কৃষক বাবলু মিয়া বলেন, চাহিদার ২০ শতাংশও টিএসপি সারের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ইউরিয়া ও ডিএপি সার সরবরাহ থাকলেও তাদেরকে প্রতিকেজি সার কিনতে ২ থেকে ৩ টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। তিনি এবছর ১২ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন।
তিনি আরও বলেন,আমার ১৭০ কেজি টিএসপি সারের প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু সংগ্রহ করেছি মাত্র ৫০ কেজি। সার ডিলারের দোকানে গেলে ডিলাররা বলছেন টিএসপি সারের সরবরাহ নেই। বাড়তি দাম দিতে চেয়েও এ সার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। সময়মতো টিএসপি সার খেতে ছিটানো না গেলে ধান গাছের শিকড় শক্ত হবে না এবং দ্রুত গাছ বেড়ে উঠতে পারবে না।

গংগাচড়া উপজেলার মহিপুর তিস্তা চরের কৃষক মোন্নাফ মিয়া বলেন, টিএসপি সার সংগ্রহ করতে তিনি তিনদিন সার বিক্রেতাদের দোকানে ধর্ণা দিয়েছেন কিন্তু চাহিদা মতো এ সারের সরবরাহ না পেয়ে চরম হতাশ হয়েছেন। ১০ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন। আপাতত ১৫০ কেজি টিএসপি সারের চাহিদা থাকলেও তিনি মাত্র ৫০ কেজি সার সংগ্রহ করেছেন বাড়তি খরচ করে। আগের বছরগুলোতে টিএসপি সার চাহিদা মতো সরবরাহ পেতাম কিন্তু এবছর তা পাচ্ছি না। সার বিক্রেতাদের বাড়তি টাতা দিতে চাচ্ছি তবুও তারা টিএসপি সার সরবরাহ করতে অপরাগতা প্রকাশ করছেন।
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরের মধ্যে কৃষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করার নির্দেশ
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান এলাকার সার ডিলার জুলহাস হোসেন জানান, কৃষকদের মাঝে বর্তমানে টিএসপি সারের ব্যাপক চাহিদা কিন্তু তাদেরকে এ সার সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। আমার দোকানে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১০ হাজার কেজি টিএসপি সারের চাহিদা কিন্তু আমি সরকারিভাবে বরাদ্দ পেয়েছি ৫০০ কেজি। সরকার সারের বরাদ্দ না দিলে আমরা কিভাবে কৃষকের চাহিদা পুরন করবো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্র জানায়, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় আম ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬,২১,৫৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ লঅখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল। গেল বছর আমন ধান চাষ হয়েছিল ৬,২১,৩৯৮ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর ১৫২ হেক্টর বেশি জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে এবছর আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসি (সার) সুত্র জানায়, সরকার প্রতিকেজি ইউরিয়া সারের খুচরা মুল্য ২৭ টাকা, টিএসপি সারের খুচরা মুল্য ২৭ টাকা ও ডিএপি সারের খুচরামুল্য ২১ টাকা নির্ধারণ করেছে। সার ডিলাররা সরকারের নিকট থেকে প্রতিকেজি সার ২ টাকা কমে কিনছে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শাইখুল আরিফিন জানান, আমন ধানের চারা রোপনের সময় টিএসপি সারের তেমন ব্যবহার নেই কিন্তু কৃষকরা এটা বুঝতে চাচ্ছেন না। তারা টিএসপি সারের প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন। ইউরিয়া ও ডিএপি সারের মধ্যেই টিএসপি সারের উপাদান পাওয়া যায় কিন্তু কৃষকদের এটা বুঝানোই যাচ্ছে না। কৃষকদের অসচেতনতার কারণে তারা ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি টিএসপি সার ব্যবহার করছেন আর এ কারণেই চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ খুবই কম মনে হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, আদর্শ কৃষির তথ্য অনুযায়ী টিএসপি সারের চাহিদাপত্র পাঠানো হয় আর সে অনুযায়ী সরকার সারের বরাদ্দ দেয়। কৃষকরা যে প্রত্যাশা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত টিএসপি সার ব্যবহার করেন তাতে জমির উপকারের চেয়ে ক্ষতি হচ্ছে। আমরা কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বাড়াচ্ছি, তিনি বলেন।
রংপুর আঞ্চলি বিএডিসি (সার)-এর যুগ্ম পরিচালক শহিদুল ইসলাম জানান, সারের কোন ঘাটতি নেই। আগামী অক্টোবর পযর্ন্ত সারের পযার্প্ত মজুত রয়েছে। কৃষি বিভাগ যে পরিমাণে সারের চাহিদাপত্র পাঠায় সে পরিমাণে সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিমাসে এসব সার তালিকাভুক্ত ডিলারের মাধ্যমে কৃষকের কাছে খুচরা দরে বিক্রি করা হয়। কোথাও যদি সারের কোন সঙ্কট দেখা দেয় অথবা বেশি দরে সার বিক্রি করা হয় তাহলে ডিলারররা বেশি লাভের আশায় সারের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে। কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন এ ব্যাপারে মাঠপর্যায়ে তদারকি করে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি








