পাটখড়িতে বাড়তি আয়, মেহেরপুরে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে
ছবি: সংগৃহীত
একসময় পাট চাষের পর পড়ে থাকা অবহেলিত উপজাত হিসেবেই বিবেচিত হতো পাটখড়ি। গ্রামের মাটির চুলায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের বাইরে এর তেমন অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে পাটখড়ির ব্যবহার ও চাহিদা বেড়েছে। এখন মেহেরপুরের কৃষকের কাছে পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়িও গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হয়ে উঠেছে।
পাটের বাজারদর নিয়ে কৃষকের প্রত্যাশা সবসময় পূরণ না হলেও পাটখড়ি বিক্রি করে উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ তুলে আনতে পারছেন তারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাটের চেয়েও পাটখড়ি বিক্রি করে বেশি অর্থ পাচ্ছেন কৃষক। এতে গত কয়েক বছর পাট চাষে লোকসানের অভিজ্ঞতা থাকলেও পাটখড়ির বাড়তি চাহিদা তাদের নতুন করে পাট আবাদে উৎসাহিত করছে।
মেহেরপুরে এক বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে কৃষকের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। গড়ে ওই জমিতে ১০ মণ পাট পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি মণ পাট প্রায় ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে পাট বিক্রি করে কৃষক প্রায় ৩০ হাজার টাকা পান। একই জমির পাটখড়ি মানভেদে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে পাট বিক্রির আয়ের পাশাপাশি পাটখড়ি থেকে বাড়তি অর্থ পাচ্ছেন কৃষক।
সদর উপজেলার পাটচাষি মাহাতাব হোসেন বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট আবাদে প্রায় ২৬ হাজার টাকা খরচ হয়। পাট বিক্রি করে খরচ বাদ দিলে বেশি লাভ থাকে না। তবে পাটখড়ি বিক্রি করে বাড়তি টাকা পাওয়া যায়, যা চাষের খরচের বড় একটি অংশ তুলে আনতে সহায়তা করে।
পাটখড়ির সবচেয়ে পুরোনো ব্যবহার জ্বালানি হিসেবে। এখনো গ্রামীণ জনপদের অনেক পরিবার শুকনো পাটখড়ি রান্নার কাজে ব্যবহার করে। পাশাপাশি বাড়ির বেড়া, গোয়ালঘর ও অস্থায়ী ঘের তৈরিতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। জমির চারপাশে এবং সবজি বা অন্যান্য ফসলকে পশুর হাত থেকে রক্ষা করতেও পাটখড়ি দিয়ে অস্থায়ী বেড়া দেওয়া হয়।
সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের কৃষক আবুল হাসান বলেন, পাটখড়ি দিয়ে বাড়ি ও জমির চারপাশে বেড়া দেওয়া যায়। শুকিয়ে রাখলে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। তাই এখন পাটখড়ি আর ফেলে রাখার জিনিস নয়।
পাটখড়ি সংরক্ষণ করাও সহজ। মাঠ থেকে সংগ্রহের পর কৃষকরা রাস্তার পাশে, মাঠে কিংবা বাড়ির উঠানে রোদে শুকিয়ে ছোট ছোট আঁটি করে সংরক্ষণ করেন। গতকাল শুক্রবার কালাচাঁদপুর গ্রামের পিচসড়কের দুপাশে পাটখড়ি শুকানোর দৃশ্য দেখা যায়।
পাটখড়ির চাহিদা এখন গ্রাম ছাড়িয়ে শহরেও পৌঁছেছে। মেহেরপুর শহরে ফেরি করে পাটখড়ি বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে কৃষকের উৎপাদিত পাটখড়ি সরাসরি গ্রামীণ বাজারের পাশাপাশি শহরের ভোক্তাদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
পাটখড়ি ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, আগে এ পণ্যের ব্যবসা এতটা ছিল না। বিভিন্ন কাজে ব্যবহার বাড়ায় বর্তমানে চাহিদাও বেড়েছে। কৃষকের কাছ থেকে মানভেদে এক বিঘা জমির পাটখড়ি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দরে কিনে গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে বিক্রি করেন তিনি। ছোট ছোট আঁটি করে বিক্রি করলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেচাকেনা করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
পাটখড়ির আরও বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে। যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে এটি দিয়ে পার্টিকেল বোর্ড ও ফাইবারবোর্ড তৈরির পাশাপাশি কাগজ, হস্তশিল্প ও পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে পাটখড়ি কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎসের পাশাপাশি গ্রামীণ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হয়ে উঠতে পারে। এতে পাটখড়ির বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগও বাড়বে।
আরও পড়ুন: উত্তর অঞ্চলে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করছেন কৃষকরা
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীব মৃধা জানান, চলতি মৌসুমে মেহেরপুরে ১৬ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। পাটের পাশাপাশি পাটখড়ি বিক্রি করে কৃষকরা উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ তুলে নিতে পারছেন। পাটখড়ির চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়ায় পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
তিনি বলেন, পাটখড়ির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো গেলে এটি কৃষকের গুরুত্বপূর্ণ বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে পাটখড়িকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা ও ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এসবি








