প্যারিসে কারফিউর মেয়াদ বৃদ্ধি, মার্সেই-লিওঁতে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত
ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ ও সহিংসতার আশঙ্কায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে দেশটির সরকার। রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত রাতের কারফিউ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে মার্সেই ও লিওঁ শহরে সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন শহরে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক স্থাপনাও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটের প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকেরা এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। তবে অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন করে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় প্রশাসন আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্যারিস পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজধানীর প্লাস দ্য লা রিপুবলিক চত্বর এবং লে আল শপিং এলাকার নির্দিষ্ট অংশে প্রতিদিন স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর থাকবে। সোমবার সকাল পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে এলাকাগুলোতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে সম্ভাব্য নতুন সহিংসতা ঠেকাতে এসব এলাকায় রাতের চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
এদিকে, শনিবারের বিক্ষোভের আশঙ্কায় প্যারিসের ল্যুভ, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্থাপনা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
দেশটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেই ও লিওঁতেও নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। সপ্তাহান্তে এসব শহরে সব ধরনের বিক্ষোভ ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। গত সপ্তাহের সহিংসতায় মার্সেইয়ে ৫০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নতুন করে সংঘর্ষ ও ভাঙচুর এড়াতে শনিবার শহরটিতে গণপরিবহন চলাচলও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিস, তুলোঁ, রুয়াঁ ও গ্রেনোবলসহ বিভিন্ন শহরে জনসমাগম এবং চলাচলের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রুয়াঁ অঞ্চলে শনিবার রাত ১১টা থেকে রোববার ভোর ৫টা পর্যন্ত আগে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জারি করা কারফিউ সব নাগরিকের ক্ষেত্রে কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় বিক্ষোভ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেখানে শনিবার কেবল অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মসূচি আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হবে। শ্রমিক সংগঠনের বাইরে অন্য গোষ্ঠীগুলোর বিক্ষোভ সম্ভব হলে নিষিদ্ধ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবিলার প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন ম্যাক্রোঁ।
তিনি অভিযোগ করেন, বামপন্থি কট্টর গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তবে বিক্ষোভের পেছনে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা খাতের দুরবস্থা ও জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষও পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে দাঙ্গা ঠেকাতে রাজপথে নামছে সেনাবাহিনী
নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহের তুলনায় পুলিশের সদস্যসংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ। আগের বিক্ষোভের ব্যাপকতা ও সহিংসতার মাত্রা সম্পর্কে সরকার যথাযথ পূর্বাভাস দিতে পারেনি এমন সমালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বড় জনসমাগম ও সহিংস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু পুলিশ সদস্যের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবিলায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গত সপ্তাহের সহিংসতার ঘটনায় ব্যাপক গ্রেপ্তার ও বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিচারবিষয়ক মন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ২১৭ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম লে ফিগারোর বরাতে মন্ত্রী জানান, আটক ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকের বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। সহিংসতার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে সরকার।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় আট লাখ। কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার পর জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বৃহত্তর বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। এতে শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী সংগঠন এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকেরা যুক্ত হন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো, শিক্ষা খাতের সমস্যার সমাধান এবং সরকারি সেবার মান উন্নত করা। কিন্তু বিভিন্ন শহরে সংঘটিত সহিংসতা ও লুটপাটের কারণে আন্দোলনের মূল দাবিগুলো অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
সহিংসতার সময় লিওঁ শহরের পর্যটন দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। লিমোজ শহরের সিটি হলেও আগুন লাগে; এতে ভবনটির ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধসে পড়ে। মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপুবলিক চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও সম্পদহানির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর বিভিন্ন শহরে কারফিউ এবং জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও প্যারিসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ফ্রান্সে থাকা মার্কিন নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। দূতাবাসের পরামর্শে বিক্ষোভ ও অস্থিরতাপূর্ণ এলাকা, জনসমাগমপূর্ণ স্থান এবং পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে এমন এলাকা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। শনিবারের সম্ভাব্য বিক্ষোভ এবং রোববারের জনসমাগমের ক্ষেত্রেও আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নতুন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাখছে প্রশাসন।
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন আগামী বছর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও জনসেবার মান নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষের সঙ্গে সহিংসতার ঘটনাগুলো যুক্ত হয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিলেও আন্দোলনকারীদের দাবির সমাধান এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ফরাসি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: এপি, লে মঁদে, ইউরোনিউজ ও ফরাসি সংবাদমাধ্যম
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








