নেপালকে হারিয়ে সাফের ফাইনাল নিশ্চিত বাংলাদেশের
ছবি: সংগৃহীত
নেপালের বিপক্ষে টানটান উত্তেজনার সেমিফাইনালে ২-১ ব্যবধানের নাটকীয় জয় তুলে নিয়ে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। ভারতের গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চে জয় নিশ্চিত করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে এই নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন করলো বাংলাদেশ।
এর আগের দুটি আসরেও এই নেপালকে পরাজিত করেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা, যার ফলে এবার দলটির সামনে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে শিরোপার হ্যাটট্রিক করার এক অনন্য ও ঐতিহাসিক সুযোগ। গ্রুপ পর্বে মালদ্বীপকে হারিয়ে এবং ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপ হিসেবে সেমিফাইনালের টিকিট কাটা বাংলাদেশ নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচেই নিজেদের চ্যাম্পিয়নসুলভ মানসিকতার প্রমাণ দিল।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের জন্য একেবারেই সুখকর কিংবা গোছানো ছিল না। খেলা শুরুর প্রথম থেকেই অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিতে থাকে নেপাল। বল দখল এবং মুহুর্মুহু আক্রমণে তারা শুরুতেই কোণঠাসা করে ফেলে বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে। ম্যাচের ২৩তম মিনিটে প্রথম সাফল্য পায় হিমালয়ের দেশটি; দীপা শাহীর নেওয়া একটি নিখুঁত কর্নার কিক বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তার সঠিকভাবে ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে বল চলে যায় ফাঁকায় দাঁড়ানো নেপালি ডিফেন্ডার গীতা রানার কাছে। সুযোগ বুঝে হালকা পায়ের টোকায় বল জালে জড়িয়ে নেপালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন গীতা। গোল হজমের পর বাংলাদেশ ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও প্রথমার্ধের সিংহভাগ সময় তাদের রক্ষণের কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে বক্সের মাথা থেকে নেপালের প্রীতি রানীর নেওয়া একটি দূরপাল্লার জোরালো শট গোলরক্ষক মিলির হাত ছুঁয়ে ক্রসবারে লেগে ফিরে আসলে নিশ্চিত দ্বিতীয় গোল হজম করা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় পিটার বাটলারের শিষ্যরা।
আরও পড়ুন: মালদ্বীপকে হারিয়ে সেমিফাইনলে বাংলাদেশ
ম্যাচের প্রথমার্ধের একদম শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ ইনজুরি সময়ের প্রথম মিনিটে দুর্দান্ত এক ম্যাজিকে ম্যাচে সমতা ফেরায় বাংলাদেশ। দলের সবচেয়ে বড় তারকা ঋতুপর্ণা চাকমা ডানপ্রান্ত থেকে এক অসাধারণ ও বাঁকানো কর্নার কিক নেন, যা নেপালের গোলরক্ষক আনজিলা সুব্বা হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সরাসরি কর্নার থেকে আসা বল গোলরক্ষকের হাতে লেগে জালে জড়ালে ফুটবল পরিভাষায় যাকে ‘অলিম্পিক গোল’ বলা হয়, সেই নান্দনিক গোলের সুবাদে ১-১ সমতায় ফেরে বাংলাদেশ। এই গোলের পর লাল-সবুজ ডাগআউটে স্বস্তি ফেরে এবং সমতার স্বস্তি নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল। বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের উত্তেজনা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
৪৭তম মিনিটে বাংলাদেশ দলের রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষকের যৌথ ভুলের সুযোগ নিয়ে নেপালের রেখা পাউদেল একটি বিপজ্জনক শট নেন, যা গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসলে আবারও রক্ষা পায় বাংলাদেশ। ম্যাচের আক্রমণের ধার বাড়াতে কোচ পিটার বাটলার কৌশলগত পরিবর্তন আনেন; ৪০তম মিনিটে সুরভী আকন্দ প্রীতির জায়গায় শামসুন্নাহার জুনিয়র এবং উমেহলা মারমার জায়গায় তহুরা খাতুনকে মাঠে নামান। পরবর্তীতে ৪৬ মিনিটে মমিতার জায়গায় মনিকা চাকমা এবং ম্যাচের শেষভাগে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীকে উঠিয়ে মাঠে নামানো হয় সুপার সাব মোসাম্মাৎ সাগরিকার।
ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট ছিল চূড়ান্ত রোমাঞ্চে ভরা। ৭৮তম মিনিটে শামসুন্নাহার জুনিয়রের পাস থেকে বল পেয়ে গোলমুখে দাঁড়িয়ে সাগরিকা একটি জোরালো শট নিলেও নেপালি গোলরক্ষক আনজিলা তা অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঘুষি মেরে রুখে দেন। ভুটানি রেফারি কর্তৃক নির্ধারিত ৬ মিনিটের ইনজুরি সময় নানা ঘটনাপ্রবাহে প্রায় ১৩ মিনিট পর্যন্ত গড়ালে নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে ডানদিক থেকে বল নিয়ে বক্সে ঢোকা শামসুন্নাহার জুনিয়রের সাথে চমৎকার বোঝাপড়ায় নেপালের রক্ষণভাগ ভেঙে বল নিয়ন্ত্রণে নেন সাগরিকা। নেপালি ডিফেন্ডারদের বাধা এড়িয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বল জালে ঠেলে দেন এই ফরোয়ার্ড। সাগরিকার এই জয়সূচক গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই লিড ধরে রেখে ফাইনালে ওঠার উল্লাসে মাতে লাল-সবুজের মেয়েরা। এই জয়ের ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেপালের বিপক্ষে টানা তিন ম্যাচে জয়ের রেকর্ড ধরে রাখল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ একাদশ: মিলি আক্তার, আফঈদা খন্দকার, শামসুন্নাহার, কোহাতি কিসকু, মমিতা খাতুন (মনিকা চাকমা, ৪৬ মিনিট), মারিয়া মান্দা (অধিনায়ক), আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী (সাগরিকা), উমেহলা মারমা (তহুরা খাতুন, ৪০ মিনিট), সুরভী আকন্দ প্রীতি (শামসুন্নাহার জুনিয়র, ৪০ মিনিট), সুরভী আক্তার আরফিন ও ঋতুপর্ণা চাকমা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








