বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে অনিশ্চিত নেইমার
ফাইল ছবি
আসন্ন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ডান পায়ের মাংসপেশির (কাফ) গুরুতর চোটের কারণে সেলেসাওদের আসন্ন প্রীতি ম্যাচগুলো থেকে ছিটকে গেছেন দলের পোস্টার বয় ও তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়র। প্রীতি ম্যাচ তো বটেই, এমনকি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও এই অভিজ্ঞ ফুটবলারের মাঠে নামা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা, যা ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের শুরুতেই বড় এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল।
গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) প্রধান চিকিৎসক রদ্রিগো লাসমার নেইমারের এই ইনজুরির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গ্রানজা কোমারিতে জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার পর নেইমারের সব ধরনের মেডিকেল পরীক্ষা ও এমআরআই স্ক্যান করানো হয়। স্ক্যানের রিপোর্টে দেখা গেছে, ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের ডান পায়ের কাফে কেবল ফোলাভাবই নয়, বরং একটি ‘গ্রেড-টু’ ক্যাফ ইনজুরি রয়েছে। এই ধরনের চোট থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে নেইমারকে আরও অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ মাঠের বাইরে কাটাতে হবে। তবে এই ইনজুরির কারণে নেইমারকে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড থেকে এখনই পুরোপুরি বাদ দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিবিএফের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত এখনও জানানো হয়নি।
এর আগে গত মঙ্গলবার নেইমার জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দিলেও ডান পায়ের কাফে অস্বস্তি ও তীব্র ফোলাভাবের কারণে বুধবারের প্রথম মাঠের অনুশীলনে অংশ নেননি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে তেরেসোপোলিসের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে স্ক্যানের জন্য পাঠানো হয়। তবে এই চোট নিয়ে ক্লাব ও জাতীয় দলের চিকিৎসকদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। ব্রাজিল দল ঘোষণার আগে নেইমারের বর্তমান ক্লাব সান্তোসের চিকিৎসক রদ্রিগো জোগাইব দাবি করেছিলেন সমস্যাটি কেবল সামান্য ফোলাভাব এবং নেইমার অনুশীলনের জন্য সম্পূর্ণ ফিট আছেন। কিন্তু জাতীয় দলের মেডিকেল বোর্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষায় সম্পূর্ণ ভিন্ন, গুরুতর ও আশঙ্কাজনক চিত্র সামনে আসে, যা সান্তোসের মেডিকেল টিমের রোগ নির্ণয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আরও পড়ুন: মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দল ঘোষণা
এই অনাকাঙ্ক্ষিত চোটের কারণে আগামী রোববার ঐতিহ্যবাহী মারাকানা স্টেডিয়ামে পানামার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে খেলতে পারছেন না নেইমার। এছাড়া ক্লিভল্যান্ডে মিসরের বিপক্ষের দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচেও তাঁর খেলা হচ্ছে না। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী ১৩ জুন নিউ জার্সিতে আফ্রিকান জায়ান্ট মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের বিশ্বকাপের প্রথম তথা উদ্বোধনী ম্যাচেও এই তারকার খেলার সম্ভাবনা এখন খুবই ক্ষীণ। উল্লেখ্য, এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল ‘সি’ গ্রুপে খেলছে, যেখানে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ হলো হাইতি ও স্কটল্যান্ড।
ব্রাজিলের নতুন হাইপ্রোফাইল কোচ কার্লো আনচেলত্তি এমনিতেই আগামী রবিবারের প্রীতি ম্যাচে একঝাঁক তারকা ফুটবলারকে পাচ্ছেন না। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে আর্সেনাল ও পিএসজির হয়ে ব্যস্ত থাকায় রক্ষণভাগের দুই প্রধান স্তম্ভ গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ও মার্কিনিওস এবং ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি আপাতত জাতীয় দলের বাইরে রয়েছেন। এর ওপর নেইমারের এই আকস্মিক ও গুরুতর চোট কোচের ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনাকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল। দীর্ঘ এক বছর পর আনচেলত্তির দলে নেইমারের ফেরা ঘিরে ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল। কারণ, আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরো এক বছর তার কৌশলে ছিলেন না ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল) এই ফরোয়ার্ড। গত কয়েক বছর ধরেই টানা চোটের বৃত্তে হাবুডুবু খাচ্ছেন নেইমার। শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফেরার পরও তিনি প্রত্যাশামতো পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। কোচ আনচেলত্তিও এর আগে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, নেইমারকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না এবং ফিটনেস ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই দলে জায়গা হবে। ফলে আপাতত নেইমারকে ছাড়াই বিশ্বকাপের বিকল্প ছক সাজাতে হচ্ছে সেলেসাওদের।
নেইমারের কাফ মাসলের এই চোটের খবরটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ২৮ বছর পুরোনো এক গভীর ক্ষত ও ট্র্যাজেডিকে নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে ব্রাজিল দল হুবহু একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। সেবারও দলের সেরা তারকা ও কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড রোমারিও কাফ মাসলে চোট পেয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ৩১ মে রোমারিও বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে তার চোট গুরুতর নয় এবং বিশ্বকাপে তিনি খেলবেন। কিন্তু চিকিৎসকদের দ্বিতীয় এমআরআই প্রতিবেদনে দেখা যায় তার মাংসপেশির ক্ষতটি বেশ গভীর। তৎকালীন প্রধান চিকিৎসক লিডিও টোলেডোর ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে শুরুতে আশাবাদী হলেও শেষ পর্যন্ত তৎকালীন কোচ জাগালোর বিশ্বকাপ দল থেকে আচমকাই বাদ পড়েন রোমারিও।
বাদ পড়ার পর ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে রোমারিও বলেছিলেন, কোচিং স্টাফরা তার শরীরের চেয়ে কাগজের রিপোর্টের ওপর বেশি ভরসা করেছিল। ২৮ বছর পর নেইমারের চোটের ধরণ এবং দলের সেরা তারকাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চয়তা যেন ১৯৯৮ সালের সেই রোমারিও ট্র্যাজেডিরই এক হুবহু পুনরাবৃত্তি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








