স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৩০, ৩০ মে ২০২৬

ব্রাজিলিয়ানদের জন্য ইউটিউবেই ফ্রি বিশ্বকাপ

ব্রাজিলিয়ানদের জন্য ইউটিউবেই ফ্রি বিশ্বকাপ

ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ সালের বহুল প্রতীক্ষিত ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর ক্ষণগণনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আগামী ১১ জুন উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় পর্দা উঠতে যাচ্ছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই ফুটবল মহাযজ্ঞের। বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই টুর্নামেন্টের আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব ও ডিজিটাল স্ট্রিমিং নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। বৈশ্বিক এই আসরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের টেলিভিশন চ্যানেল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে স্বত্বাধিকার পাওয়ার প্রতিযোগিতা চললেও, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিলের দর্শকদের জন্য এসেছে এক নজিরবিহীন ও দুর্দান্ত সুখবর। তবে এর বিপরীতে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগীদের মনে এখনও কাটেনি খেলা দেখা নিয়ে তৈরি হওয়া গভীর অনিশ্চয়তা।

লাতিন আমেরিকার ফুটবল ক্রেজ ব্রাজিলের সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে এসেছে এক অনন্য উপহার। দেশটির দর্শকরা কোনো প্রকার বাড়তি খরচ বা সাবস্ক্রিপশন ছাড়াই জনপ্রিয় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিশ্বকাপের সবকটি ম্যাচ সরাসরি উপভোগ করতে পারবেন। ব্রাজিলের খ্যাতনামা ক্রীড়া গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘লাইভমোড’ (LiveMode)-এর অংশীদার প্ল্যাটফর্ম ‘কাজেটিভি’ (CazéTV) অফিসিয়ালি ঘোষণা করেছে যে, তারা এবারের আসরের মোট ১০৪টি ম্যাচের সবগুলোই ব্রাজিলের অভ্যন্তরে বিনামূল্যে সরাসরি সম্প্রচার করবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ ব্যবসায়িক ও কৌশলগত দিক। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম মহাতারকা এবং সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই ব্রাজিলিয়ান স্পোর্টস মিডিয়া কোম্পানি লাইভমোড-এ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। রোনালদোর বিনিয়োগপুষ্ট এই প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কই মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে ফুটবল সম্প্রচারের এই বিশাল উদ্যোগকে সফল করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।

ব্রাজিলিয়ান জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা ও স্ট্রিমার কাসিমিরো মিগুয়েল ২০২২ সালে লাইভমোডের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই ‘কাজেটিভি’ বা 'কেজটিভি' চ্যানেলটি চালু করেন। আত্মপ্রকাশের বছরই কাতার বিশ্বকাপের নির্বাচিত কিছু ম্যাচ অত্যন্ত সফলভাবে লাইভ স্ট্রিম করে ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে প্ল্যাটফর্মটি। পরবর্তীতে তারা তাদের সম্প্রচারের পরিধি আরও বাড়িয়ে ফিফা নারী বিশ্বকাপ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং অলিম্পিক গেমসের মতো বিশ্বের বড় বড় ক্রীড়া আসর সাফল্যের সঙ্গে কাভার করে বিশ্বস্ততা অর্জন করে। আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কাজেটিভি ব্রাজিলের নাগরিকদের জন্য আরও এক ধাপ এগিয়ে অতি উচ্চমানের অর্থাৎ ফোরকে (4K) রেজল্যুশনে ম্যাচগুলো লাইভ স্ট্রিম করার মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। শুধু মাঠের ফুটবল ম্যাচই নয়, তরুণ প্রজন্ম ও আধুনিক ফুটবল ভক্তদের আকৃষ্ট করতে তারা ম্যাচগুলোর পাশাপাশি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মাঠের ভেতরের ও বাইরের নানা অজানা গল্প, পর্দার পেছনের বিশেষ দৃশ্য এবং দর্শকদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন ইন্টারঅ্যাক্টিভ সেশনেরও আয়োজন করতে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ‘২০৩০ বিশ্বকাপে রোনালদো খেলবে, কারও সন্দেহ থাকা উচিত নয়’

ব্রাজিলের দর্শকদের জন্য এটি চরম আনন্দের খবর হলেও, বাংলাদেশ বা ভারতের ফুটবল ভক্তরা এই ডিজিটাল সুবিধাটি কোনোভাবেই উপভোগ করতে পারবেন না। কাজেটিভি ও লাইভমোড কর্তৃপক্ষ ফিফার কাছ থেকে বিশ্বকাপের যে ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব বা ব্রডকাস্ট রাইটস কিনেছে, তা কঠোরভাবে কেবল ব্রাজিলিয়ান অঞ্চলের (Brazilian Region) ভৌগোলিক সীমানার জন্যই বৈধ। ফলে আন্তর্জাতিক কপিরাইট ও সম্প্রচার আইন মেনে ব্রাজিলের বাইরে অন্যান্য দেশের দর্শকদের জন্য এই অনলাইন সম্প্রচারসেবাটি সম্পূর্ণ ‘জিও-ব্লক’ (Geo-blocked) বা ভৌগোলিকভাবে লক করে রাখা হবে। বাংলাদেশ, ভারত বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশ থেকে ফুটবলপ্রেমীরা ইউটিউব, টুইচ কিংবা এক্সে (সাবেক টুইটার) কাজেটিভির অফিশিয়াল চ্যানেল বা পেজটি খুঁজে পেলেও, খেলা শুরুর পর লাইভ স্ট্রিমিং অপশনে প্রবেশ করতে পারবেন না। লাইভ স্ক্রিনে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার নোটিশ দেখাবে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দর্শকদের জন্য স্থানীয় বৈধ চ্যানেলের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকছে না।

বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও ভারতে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মূল সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা না হওয়ায় সমর্থকদের মাঝে তীব্র উদ্বেগ ও কিছুটা ধোঁয়াশা বিরাজ করছে। তবে ভারতের সম্প্রচার বাজারের সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, সেখানে বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো দেখানোর দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেটওয়ার্ক ‘জি’ (Zee)। তারা মূলত নিজেদের ডেডিকেটেড স্পোর্টস চ্যানেল এবং তাদের জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘জিফাইভ’ (Zee5) অ্যাপের মাধ্যমে টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো সরাসরি দেখানোর নীতিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, যদিও নেটওয়ার্কটির পক্ষ থেকে এখনও কোনো চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

এদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা কাটাতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক তৎপরতা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, শুরুতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক মিডিয়া’ (Springbok Media) বাংলাদেশের বাজারের জন্য ফিফার সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নিয়েছিল। কিন্তু তারা স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ওপর অত্যন্ত চড়া মূল্য এবং এমন কিছু জটিল ও কঠিন শর্ত আরোপ করে, যার ফলে বাংলাদেশের কোনো সরকারি বা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের পক্ষেই বিপুল অর্থ খরচ করে এই স্বত্ব কিনে সরাসরি সম্প্রচার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এই অচলাবস্থার মাঝেই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হলো, সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী স্প্রিংবক মিডিয়া শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে এবং সরে দাঁড়িয়েছে।

স্প্রিংবক মিডিয়া সরে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় ব্রডকাস্টারদের জন্য এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের (ফিফা) সাথে টেবিল বৈঠকে বসার এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে দর-কষাকষি করার একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের যৌথ হস্তক্ষেপে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী মিডিয়া কনসোর্টিয়াম বা নির্দিষ্ট কোনো বড় চ্যানেলের সাথে ফিফার চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা জোরালো আশা প্রকাশ করছেন। 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘বিটিভি’ কিংবা দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো বেসরকারি স্পোর্টস বা সাধারণ চ্যানেল থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় দর্শকদের কিছুটা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে খেলা দেখার আকুলতায় কোনো ধরনের অননুমোদিত ওয়েবসাইট, ম্যালওয়্যারযুক্ত পাইরেটেড লিঙ্ক কিংবা অবৈধ আইপিটিভিতে ক্লিক না করার জন্য বিশেষভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সব সংশয় ও মেঘ কেটে গিয়ে ঠিক কোন শুভক্ষণে এবং কোন দেশীয় চ্যানেলের পর্দায় বেজে উঠবে ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল সুর।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়