News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:১১, ৩ জুন ২০২৬

বৃদ্ধা মায়ের পচনধরা লাশ উদ্ধার: ওএসডি হলেন যুগ্ম সচিব ছেলে

বৃদ্ধা মায়ের পচনধরা লাশ উদ্ধার: ওএসডি হলেন যুগ্ম সচিব ছেলে

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পোকা ধরা ও পচা-গলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। উচ্চপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের চরম অবহেলার শিকার হয়ে ওই বৃদ্ধার এমন মর্মান্তিক ও অমানবিক পরিণতির পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। 

ঘটনার জেরে প্রয়াত বৃদ্ধার বড় ছেলে এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) হিসেবে কর্মরত সরকারের যুগ্ম সচিব ড. এ কে এম আনিসুর রহমানকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়েছে। 

বুধবার (০৩ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবারের (০৪ জুন) মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে, অন্যথায় তিনি ওইদিন অপরাহ্ণে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন। এই চাঞ্চল্যকর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের বিষয়ে ড. আনিসুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এর আগে আজ দুপুরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিষয়টি সরকারের গভীর বিবেচনায় রয়েছে এবং পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। 

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হলেও আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন, তাই পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাতে ওই কর্মকর্তাকে ওএসডি করার প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রশাসন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রয়াত নূরজাহান বেগমের সন্তানেরা সবাই সমাজে উচ্চশিক্ষিত ও অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত। তার এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক এবং একমাত্র মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষিকা। 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সন্তান থাকা সত্ত্বেও নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে চরম একাকী ও অবহেলিত জীবনযাপন করছিলেন। দুই ছেলে আলাদা থাকতেন এবং দীর্ঘদিন ধরে মায়ের সাথে তাদের কোনো নিয়মিত যোগাযোগ বা খোঁজখবর ছিল না। গত ৩১ মে (রবিবার) মিরপুর-১১ নম্বরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে নূরজাহান বেগমের গলিত ও পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ।

আরও পড়ুন: তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানান, নূরজাহান বেগম মূলত তার মেয়ের সাথে ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন। তবে মরদেহ উদ্ধারের সময় পুরো বাসাটি অত্যন্ত নোংরা, অগোছালো এবং চরম অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পাওয়া যায়। মর্মান্তিক বিষয় হলো, মায়ের সাথে একই ফ্ল্যাটের পাশাপাশি রুমে বসবাস করলেও তার মেয়ে মৃত্যুর বিষয়টি রহস্যজনকভাবে কাউকেই জানাননি। মৃত্যুর পর মরদেহটিতে পচন ধরে পুরো এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দেন, যার মাধ্যমে এই লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই বাসার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ঘরের ভেতর প্রবীণ নারীর মৃতদেহের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে এক ভয়াবহ ও বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যা দেখে পুলিশ কর্মকর্তারাও স্তম্ভিত হয়ে যান। এই ঘটনার পর গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীরা ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে দীর্ঘ সময় কলবেল দিয়ে অপেক্ষা করলেও ভেতর থেকে কেউ দরজা খোলেননি। প্রতিবেশীরা এই মৃত্যু নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সমাজে এত প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের উপস্থিতিতে একজন মায়ের এমন পচনধরা মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই অমানবিক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশের সচেতন মহলে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ (যা ২০২৩ সালে বিধিমালা আকারে চূড়ান্ত হয়) নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা ও সচেতনতা তৈরি হয়েছে। 

আইনজীবীরা জানান, এই আইন অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ, নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকে, তবে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে এই দায়িত্ব বণ্টন করে নিতে হবে। কোনো সন্তান যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন বা পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেন, তবে তা আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। 

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চাকরি বিধিমালা এবং দেশের প্রচলিত এই আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত সন্তানদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়