নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৩৮, ৩ জুন ২০২৬

হাদি হত্যা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ ভাইয়ের

হাদি হত্যা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ ভাইয়ের

ছবি: সংগৃহীত

ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তার বড় ভাই শরীফ ওমর বিন হাদি। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (চুক্তিভিত্তিক) হিসেবে কর্মরত এই সরকারি কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে পরপর দুটি স্ট্যাটাস দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে দাবি করেন। 

তার এই চাঞ্চল্যকর পোস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা, বিএনপির সাবেক এমপি-মন্ত্রী এবং জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ব্যক্তিগত সহকারীর (পিএস) বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এদিকে একই দিনে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্য এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে এক নতুন আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করেছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে।

মঙ্গলবার রাত ৯টা ৩৩ মিনিটে দেওয়া প্রথম ফেসবুক পোস্টে শরীফ ওমর হাদি সরাসরি দেশের শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারক এবং বর্তমান প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। 

তিনি লিখেন, শহীদ ওসমান হাদির খুনের সাথে ইন্টেরিম (অন্তর্বর্তী) সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী সরাসরি জড়িত। 

পোস্টে তিনি বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন এবং এক হুঁশিয়ারি বার্তায় বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, হাদি হত্যার সাথে জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করুন। হাদি হত্যার বিচার না করলে আপনাকেও এরা হত্যা করবে, যেভাবে আপনার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেছে। হাদি হত্যার বিচার আপনি না করলে আপনাকে হত্যা করলেও কেউ বিচার করবে না। হাদি হত্যার বিচার বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য রেড লাইন। হাদি হত্যার বিচার করুন। 

প্রথম পোস্টের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঠিক দেড় ঘণ্টার মাথায়, রাত ১১টা মিনিটে তিনি আরেকটি সম্পূরক পোস্ট দেন। 

সেখানে হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে জামায়াতের সম্পৃক্ততার দাবি তুলে তিনি লিখেন, শহীদ ওসমান হাদি হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরিতে আমিরে জামায়াতের একজন পিএস (ব্যক্তিগত সহকারী) জড়িত। হাদিকে ঢাকা-০৮ আসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রেশার দিছে আমাদের।

ওমর হাদির এই দুটি পোস্ট ফেসবুক ও অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে আপলোড হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কূটনীতিক হয়েও তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট নাম-পরিচয় উল্লেখ না করে এভাবে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের দিকে আঙুল তোলায় অনেকেই হতবাক হয়েছেন। নেটিজেনদের একাংশ এই ফেসবুক অ্যাকাউন্টটির নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন; তাদের মতে, অ্যাকাউন্টটি হ্যাকড হয়েছে কিংবা ওমর হাদির নিয়ন্ত্রণে নেই। 
অন্যদিকে, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রকাশ্য প্ল্যাটফর্মে এমন রাজনৈতিক ও সংবেদনশীল বক্তব্য দেওয়ায় তার চাকরিগত বিধিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। গত বছরের ২৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে কঠোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট বলা আছে মাঠ পর্যায় কিংবা বৈদেশিক মিশনে কর্মরত কর্মকর্তারা ‘ব্যক্তিগত’ বা ‘পেশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়’ এমন কোনো বিষয়ে ফেসবুকে লিখতে বা ছবি দিতে পারবেন না, তারা কেবল সরকারের ইতিবাচক ও উদ্ভাবনমূলক কাজ প্রচার করবেন। ফলে ওমর হাদির এই পোস্ট বিধিমালা ভঙ্গের শামিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘আ.লীগ নেতাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে ৩ কোটি দাবি করেছিলেন হান্নান মাসউদ’

এই অভ্যন্তরীণ বিতর্কের সমান্তরালে, একই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ধর্মতলায় এক বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশে তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া একটি বক্তব্য ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর মোড় এনে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার বক্তব্যে নাম উল্লেখ না করে বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য গোপনের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। 

তিনি জনসভায় বলেন, বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ (স্পেশাল টাস্ক ফোর্স) গ্রেফতার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার অধিকারও নেই। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি তা হলো ওই হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে এবং আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে, যা তাদের বড় কৃতিত্ব। কিন্তু তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, আপনি রাজ্য পুলিশকে জানিয়ে দিন এটা যেন বাইরে না যায়, কারণ এটা দেশের ব্যাপার। 

অমিত শাহর দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে মমতা আরও বলেন, কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা তথ্যের ভাণ্ডার। এতদিন দেশের স্বার্থে মুখ খুলিনি, কিন্তু আজকে অত্যাচার শেষ সীমায় গেছে বলে আমাকে বলতে হচ্ছে। আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার ইঙ্গিত মূলত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকেই ছিল। সীমান্তে খুনিদের অনুপ্রবেশ এবং কলকাতার এসটিএফের হাতে ধরা পড়ার যে বিবরণ মমতা দিয়েছেন, তার সঙ্গে হাদি হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনাবলির হুবহু মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। একদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য চেপে যাওয়ার তাগিদ এবং অন্যদিকে নিহত হাদির ভাই ওমর হাদির বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের জড়িয়ে দেওয়া ফেসবুক পোস্ট সব মিলিয়ে ওসমান হাদি হত্যা ইস্যুটি এখন আর কোনো সাধারণ অপরাধের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এই জোড়া ঘটনাপ্রবাহে পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে গভীর কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দেশের ভেতরের ও বাইরের কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায় কিংবা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক থমথমে রহস্যময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়