বিদ্যুতের দাম বাড়ল ১৬.৬৮%, পাইকারিতে ১৯.৮৫%
ফাইল ছবি
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক প্রশাসনিক ঘোষণার মাধ্যমে দেশে পাইকারি ও গ্রাহক উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির নতুন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে, যা চলতি জুন মাসের বিলিং চক্র থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে।
বুধবার (০৩ জুন) রাজধানীর রমনায় অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই মূল্যহার ঘোষণা করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
নতুন সমন্বয় অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সাথে বিদ্যুতের সঞ্চালন খরচ বা হুইলিং চার্জও ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তবে গ্রাহকদের ওপর বাড়তি খরচের চাপ কিছুটা লাঘব করতে বিভিন্ন গ্রাহক শ্রেণির বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ বা ডিমান্ড ফি সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নতুন মূল্যতালিকা কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
বিদ্যুতের এই নতুন মূল্য কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায়। তবে গ্রাহকদের ব্যবহারের তারতম্য ও বিভিন্ন ধাপ (স্লাব) বিবেচনায় এই দাম বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে, যার মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও ১৫ শতাংশ দাম বেড়েছে। অন্যদিকে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে গড় মূল্য ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)-এর সঞ্চালন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ভারিত গড়ে প্রতি ইউনিট সঞ্চালন খরচ ৩১ পয়সা (নির্দিষ্টভাবে ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা) থেকে প্রায় ৮ পয়সা বাড়িয়ে ৩৯ পয়সা (নির্দিষ্টভাবে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা) করা হয়েছে, যা মূলত প্রতি ইউনিটে প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধির সমতুল্য।
বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানির আর্থিক লোকসান ও ক্রমবর্ধমান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সমন্বয়ের লক্ষ্যে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে শুল্ক প্রস্তাব নেওয়ার পর গত ২০ ও ২১ মে দুই দিনব্যাপী গণশুনানি আয়োজন করে বিইআরসি।
আরও পড়ুন: জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি সভা-প্রশিক্ষণে অনলাইন অংশগ্রহণের নির্দেশনা
সেই শুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিটে ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর আবেদন করেছিল; যার মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়।
এছাড়া পাইকারি পর্যায়ে বিপিডিবি ইউনিট প্রতি ১ টাকা ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১ টাকা ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) পর্যন্ত দাম বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে বলেছিল যে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা এবং তখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় পড়বে প্রায় ১২ টাকা ৯১ পয়সার মতো।
অন্যদিকে, সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবি তাদের প্রতি ইউনিটের খরচ ৩০ ও ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে যথাক্রমে ৪৮ ও ৪৯ পয়সা করার আবেদন করলেও কমিশন সার্বিক দিক বিবেচনা করে তা ৩৯ পয়সায় সীমিত রাখে।
জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে কোনো প্রকার বাহ্যিক চাপ ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এই দাম বাড়ানো হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
তিনি স্বীকার করেন যে, এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, তবে এর সার্বিক প্রভাব নিয়ে কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এখনো করা হয়নি, যা পরবর্তীতে করার সুযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিচালনা প্রক্রিয়া অনুযায়ী, পিডিবি সরকারি ও বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তিভিত্তিক নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ ক্রয় করে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করে এবং এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে পিডিবিকে প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি নিতে হয়।
বিইআরসি জানিয়েছে, বর্তমান দফায় দাম বাড়ানোর পরেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিশাল ঘাটতি পুরোপুরি মেটানো সম্ভব হবে না এবং সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যার দুই বছর পর আবারও এই নতুন মূল্যহার কার্যকর হলো।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








