বিটিভিতে বিশ্বকাপ সম্প্রচার অনিশ্চয়তা কাটছে
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনা এখন একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সব প্রক্রিয়া ইতিবাচকভাবে সম্পন্ন হলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো সরাসরি সম্প্রচার করবে। সরকারের এই সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মাঝে বিশ্বকাপ খেলা দেখা নিয়ে যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিভির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বুধবার (০৩ জুন) গণমাধ্যমকে এই আলোচনার অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে স্পর্শকাতর ও প্রক্রিয়াধীন বিষয় হওয়ায় এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে রাজি হননি।
সার্বিক পরিস্থিতি ও আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, জনগণের করের টাকা বা রাষ্ট্রীয় তহবিল (পাবলিক মানি) অপচয় না করে দেশের সাধারণ মানুষকে বৈশ্বিক ফুটবলের এই মহারণ দেখানোর জন্য সব পক্ষের সঙ্গে অত্যন্ত সুচারুভাবে আলোচনা চলছে এবং এর অগ্রগতি বেশ সন্তোষজনক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বিবরণ অনুযায়ী, আগামী ১১ জুন থেকে মাঠে গড়াতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ এই আসর। এর আগে বাংলাদেশে এবারের বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব পেয়েছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রীড়া বিপণন প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড’।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশি টেলিভিশন বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উক্ত সিঙ্গাপুরি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চড়া মূল্যে স্বত্ব কিনে দেশে খেলা দেখানোর কথা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রচারস্বত্ব বাবদ বিটিভির কাছে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা দাবি করে, যা কর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি-সহ প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াত। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে সরকার অনীহা প্রকাশ করায় শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে বাংলাদেশে কোনো গ্রাহক বা ক্রেতা খুঁজে না পেয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠানটি স্বত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ দেখানোর সুখবর পেল ভারত
এই জটিল পরিস্থিতির পর বাংলাদেশ সরকার সরাসরি ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সম্প্রচারস্বত্ব পাওয়ার লক্ষ্যে ফিফার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ইতোমধ্যে কয়েক দফা ফলপ্রসূ বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সরাসরি যুক্ত থেকে কাজ করছেন।
মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছে, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে ফিফার সঙ্গে এই আলোচনা চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর বিটিভি মূল সম্প্রচারস্বত্ব গ্রহণ করবে এবং পরবর্তীতে দেশের বেসরকারি যেসব টেলিভিশন চ্যানেল খেলা দেখাতে আগ্রহী, তারা বিটিভির কাছ থেকে সাব-লাইসেন্স বা স্বত্ব গ্রহণ করে খেলা সম্প্রচার করতে পারবে।
টেলিভিশন সম্প্রচারের পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও ফুটবলপ্রেমীদের জন্য থাকছে সুখবর।
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম ‘টফি’র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে ফিফা বিশ্বকাপের ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব সফলভাবে লাভ করেছে। মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক এবং টফির যৌথ উদ্যোগে দেশের ফুটবল অনুরাগীরা যেকোনো স্থান থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্যে বিশ্বকাপের সব ম্যাচ উপভোগ করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে এমন জটিলতা ও খেলা দেখা নিয়ে অনিশ্চয়তা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং ভারত ও চীনের মতো বিশাল ফুটবল সমর্থকগোষ্ঠীর দেশেও তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফিফা চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) সঙ্গে ২০২৬ ও ২০৩০ সালের পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ ও ২০৩১ সালের নারী বিশ্বকাপের সম্প্রচার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। একইভাবে ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘জি এন্টারটেইনমেন্ট’–এর সঙ্গেও ফিফার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলে ওই অঞ্চলের অনিশ্চয়তাও দূর হয়েছে।
বিটিভির অতীত সম্প্রচার রেকর্ড পর্যালোচনা করে জানা গেছে, এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের সময় বিটিভি ‘প্যাকেজ নীতিমালা’র আওতায় কোনো ধরনের আর্থিক খরচ ছাড়াই দেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার করার সুযোগ পেয়েছিল। তৎকালীন নীতি অনুযায়ী, মূল স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিটিভির কারিগরি সহায়তায় তাদের চ্যানেলে খেলা সম্প্রচার করত। তবে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের আগে এই নীতিমালাটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে বিগত ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় শেষ মুহূর্তে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে ‘বিশেষ বাজেটে’ প্রায় ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে হয়েছিল। তবে এবার সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সাশ্রয়ী কৌশলে সরাসরি ফিফার সঙ্গে দরকষাকষি করছে, যা সফল হলে দেশের ইতিহাসে কোনো বড় রাষ্ট্রীয় খরচ ছাড়াই সাধারণ মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বকাপের জমজমাট আসর উপভোগ করতে পারবেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








