নিপাহ আতঙ্কে অনিশ্চয়তায় ভারতের বিশ্বকাপ, এশিয়াজুড়ে সতর্কতা
ছবি: সংগৃহীত
ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এখন সীমান্তীয় উত্তেজনা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নয়, একদমই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে পড়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন প্রদেশে নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব ক্রিকেটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) ইতোমধ্যেই আইসিসির কাছে দাবী জানিয়েছে, খেলোয়াড় ও দর্শকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশ্বকাপকে ভারতের বাইরে নিরপেক্ষ কোনো ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হোক।
পশ্চিমবঙ্গের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ কেন্দ্র হিসেবে শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন একজন রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ভাইরাসের বিস্তার রোধে অন্তত ১০০ জনকে কঠোর কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। একই হাসপাতালে সেবা দিতে গিয়ে একজন নার্সও সংক্রমিত হয়েছেন; তার শারীরিক অবস্থাকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬) যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গণমাধ্যম ‘ইনডিপেনডেন্ট’-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে অন্তত পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় একজন পুরুষ ও একজন নারী নার্স আক্রান্ত হলেও পরবর্তীতে ওই হাসপাতালের একজন চিকিৎসক এবং আরও এক কর্মচারীর শরীরেও ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়।
এ পরিস্থিতির মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত যাত্রীদের জন্য সুবর্ণভূমি, ডন মুয়াং ও ফুকেট বিমানবন্দরে জ্বর ও নিপাহ-সংশ্লিষ্ট উপসর্গ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা চালু করেছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের ‘বিওয়্যার’ কার্ড দেওয়া হচ্ছে, যেখানে অসুস্থ বোধ করলে কী করণীয় তা উল্লেখ রয়েছে। ফুকেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রোগনিয়ন্ত্রণ প্রস্তুতিও বাড়ানো হয়েছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জানান, দেশটিতে এখনও নিপাহ সংক্রমণ ধরা পড়েনি, তবে নজরদারি উচ্চমাত্রায় রাখা হবে; সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে যাত্রীদের কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে পাঠানো হবে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মিডিয়া অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল করল আইসিসি
তিনি আরও বলেন, গুহা ও প্রাকৃতিক পর্যটন এলাকায় বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং শিকার ও বন্য প্রাণী না খাওয়ার নীতিতে পর্যটকদের সতর্ক করা হয়েছে।
নেপালও সতর্কতা জারি করেছে। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্তগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতিদিনের যাতায়াতের কারণে নেপালের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তাইওয়ান নিপাহ ভাইরাসকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাহকে সম্ভাব্য মহামারি সৃষ্টিকারী অগ্রাধিকারভুক্ত ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিপাহ জ্যুনোটিক ভাইরাস প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়, প্রধানত সংক্রমিত বাদুড় ও শূকর থেকে। পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ মানবিক সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটতে পারে। নিপাহ সংক্রমণে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি; অতীতে এটি ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সংক্রমণের শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা ও কাশি দেখা দিলেও দ্রুত তা এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) এবং তীব্র শ্বাসকষ্টে রূপ নিতে পারে। যারা সুস্থ হয়, তাদের মধ্যে অনেকের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে খিঁচুনি বা ব্যক্তিত্ব পরিবর্তনের মতো স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি; মূলত সাপোর্টিভ কেয়ার ও উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসার ওপরই নির্ভর করতে হয়।
এ অবস্থায় ভারতজুড়ে নিপাহ সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতি বিশ্ব ক্রিকেটে নিরাপত্তা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পিসিবি তাদের উদ্বেগ আইসিসির কাছে জানিয়েছে এবং দাবি করেছে, খেলোয়াড় ও দর্শকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ভারতকে আয়োজক দেশ হিসেবে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপকে অন্য কোনো নিরাপদ ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হোক।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








