নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৫৬, ৭ জুন ২০২৬

১৫ দিনের ঈদযাত্রায় ৪৪২ দুর্ঘটনা, নিহত ৪৩৮

১৫ দিনের ঈদযাত্রায় ৪৪২ দুর্ঘটনা, নিহত ৪৩৮

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা এবং ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরার সময়ে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় আরও বেড়েছে। ঈদযাত্রার ১৫ দিনে সারাদেশে মোট ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৪০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

রবিবার (০৭ জুন) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-র সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ তথ্য তুলে ধরেন। সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের পর্যবেক্ষণ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে কর্মস্থলে ফেরার শেষ দিন ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সড়কপথে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হন। অন্যদিকে নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৩ জন এবং আহত হন আরও ১৬ জন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে সংঘটিত ৪৪২টি দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৩৮ জনে।

সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ঈদুল আজহার তুলনায় এবার দুর্ঘটনা, প্রাণহানি এবং আহতের সংখ্যা তিনটিই বেড়েছে। ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত এবং ১ হাজার ১৮২ জন আহত হয়েছিলেন। সেই তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার আধিপত্য। বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ঈদযাত্রার ১৫ দিনে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক, যা দেশে মোটরসাইকেল ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

নিহত ও আহতদের পেশাগত ও সামাজিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকারদের মধ্যে ৮০ জন চালক, ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু এবং ৬৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। এছাড়া পাঁচজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, তিনজন শিক্ষক, একজন চিকিৎসক, তিনজন সাংবাদিক, একজন প্রকৌশলী এবং চারজন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের ধরন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাস, ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ কার ও মাইক্রোবাস, ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

দুর্ঘটনার প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। এছাড়া ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা গাড়ির চাপা বা ধাক্কায়, ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে বা রাস্তার পাশে পড়ে যাওয়ার কারণে, ১ দশমিক ৫২ শতাংশ ট্রেন ও যানবাহনের সংঘর্ষে এবং বাকি ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ বিভিন্ন অন্যান্য কারণে সংঘটিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: ২০২৫ সালেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ঢামেকে ১১০০ নারী

স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে সংঘটিত হয়েছে। আঞ্চলিক সড়ক ও মহানগর এলাকায় ঘটেছে ৩০ দশমিক ৭১ শতাংশ দুর্ঘটনা। এছাড়া ১ দশমিক ৫২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে রেলক্রসিংয়ে এবং ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ ফিডার রোডে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে সংঘটিত দুর্ঘটনার হার ছিল শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, এবারের ঈদযাত্রায় বৃষ্টির কারণে দেশের বহু সড়ক ও মহাসড়কে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্ত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ভাঙাচোরা সড়ক, অবকাঠামোগত ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে যান চলাচল এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চালক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একজন চালকের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় বিরামহীনভাবে পরিচালিত হয়েছে। এতে ক্লান্তিজনিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কিছু পরিবহন মালিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া কিংবা ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন যথাযথ মেরামত ছাড়াই সড়কে নামিয়েছেন। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস খাদ, খাল-বিল কিংবা রাস্তার পাশের নিচু স্থানে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও এবার তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

সংগঠনটির মতে, জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, সড়কে মিডিয়ানের অভাব, রোড সাইন ও রোড মার্কিংয়ের ঘাটতি, নির্মাণ ত্রুটি, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বিরামহীন ড্রাইভিং, চাঁদাবাজি এবং বৃষ্টিজনিত সড়ক ক্ষয়—এসব কারণ দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর দুই ঈদে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত ঘটে। তাই কেবল ঈদকেন্দ্রিক ১০ থেকে ১২ দিনের তৎপরতা দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানুষের জীবন রক্ষা এবং যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি গণপরিবহন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু, মহাসড়ক থেকে ছোট যানবাহন পর্যায়ক্রমে অপসারণ, চালকদের দক্ষতা উন্নয়ন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদ এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে আন্তর্জাতিক মানের ‘স্টার’ সড়ক নিরাপত্তা করিডোর প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

এছাড়া সংগঠনটি ঈদযাত্রা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত নির্মাণ, চালকদের নির্ধারিত বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, চাঁদাবাজি বন্ধ, আধুনিক রোড সাইন ও মার্কিং স্থাপন, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা, ফিটনেস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন অপসারণ, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের একচেটিয়া প্রভাব কমানোর সুপারিশ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সচিব এ ওয়াই এম একরামুল হক, অর্পনা রায় দাশ, মাহমুদুল হাসান রাসেল, মো. আলমগীর কবির বিটু এবং মনজুর হোসেন ইসাসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়