নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:২৮, ৭ জুন ২০২৬

২০২৫ সালেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ঢামেকে ১১০০ নারী

২০২৫ সালেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ঢামেকে ১১০০ নারী

ফাইল ছবি

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। 

বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সাফল্য সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং শিশু সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ও সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একযোগে সমন্বিত সামাজিক আন্দোলনে নামার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শনিবার (০৬ জুন) রাজধানীতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য ও তাগিদ উঠে আসে। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম। এতে দেশের বর্তমান নাজুক শিশু সুরক্ষা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী 'জাতীয় শিশু সুরক্ষা টাস্কফোর্স' গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

গোলটেবিল বৈঠকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান দেশের নারী ও শিশু নির্যাতনের এক শিউরে ওঠার মতো বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, শুধু সদ্যসমাপ্ত ২০২৫ সালেই ধর্ষণের শিকার বা গুরুতর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ১ হাজার ১০০ জন নারী ও শিশু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন। 

চিকিৎসকদের মতে, এই একটিমাত্র হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে মাঠপর্যায়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের গভীরতা কতটা ভয়াবহ এবং তা কতটা মহামারি রূপ ধারণ করেছে।

এই বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আলোচিত ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসার পিতা হান্নান মোল্লা বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তার কন্যার ওপর চালানো নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের দাবি জানান। তার আবেগঘন ও অশ্রুসিক্ত বক্তব্যে অনুষ্ঠানস্থলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আলোচকরা বলেন, রামিসাদের হারানোর এই অন্তহীন মিছিল থামাতে না পারলে সভ্য সমাজ বিনির্মাণ অসম্ভব।

যৌন সহিংসতা ও পারিবারিক শাসনের নামে শিশুদের ওপর নির্মমতার যে পরিসংখ্যান বৈঠকে উপস্থাপিত হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইউনিসেফ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (এমআইসিএস)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জনই কোনো না কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ যা সংখ্যায় ৪৫ মিলিয়নেরও বেশি নিজেদের পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ভায়োলেন্ট ডিসিপ্লিন’ বা সহিংস শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নথিবদ্ধ তথ্যমতে, ২০২৪ সালে যেখানে বছরজুড়ে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ২৩৪টি, সেখানে গত এক বছরে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৬টিতে। একই সময়ে শিশু ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ৬৬টি থেকে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে ১২৯টিতে পৌঁছেছে। অথচ এই বিপুল অপরাধের বিপরীতে বিচারের হার অত্যন্ত হতাশাজনক। 

ইউনিসেফের ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় ৫৬৬টিরও বেশি মামলা দায়ের হলেও আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাত্র ২ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীদের দণ্ডাদেশ বা শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

আরও পড়ুন: শিশু নির্যাতন রোধে জাতীয় শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান

চলতি বছরের সংকটকাল উল্লেখ করে আয়োজক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসেই ৯৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩২ জন শিশু ও ৭৫ জন নারী সরাসরি ধর্ষণের শিকার এবং একই সময়ে ২০৭ জন নারী ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। 

অপরদিকে, ভুক্তভোগীদের সহায়তায় পরিচালিত জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ‘১০৯৮’-এ গত বছরের কেবল জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৫১টি কল এসেছে, যার মধ্যে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৪৩৫টি কলই ছিল সরাসরি নির্যাতন, পাচার-শোষণ এবং মানসিক ও সামাজিক সহায়তা সংক্রান্ত জরুরি আবেদন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, শিশু সুরক্ষাকে এখন আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কেবল সরকারি দপ্তরের ওপর ভরসা না করে আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে এক ছাতার নিচে এনে একটি কার্যকর জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন নৈতিক অবক্ষয় রোধে পরিবারের ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে বলেন, শিশুদের সুনাগরিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তোলার প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, সমাজে দিন দিন মাদকের যে বিস্তার ঘটছে, তা শিশু নির্যাতনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। মাদকসহ সমাজের কয়েকটি বড় বড় সামাজিক ব্যাধি যদি রাষ্ট্র কঠোরহস্তে নির্মূল করতে পারে, তবে শিশু নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশনা ইমাম আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও সংস্কারের দিকগুলো তুলে ধরে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব মামলার নিষ্পত্তির তাগিদ দেন।

বৈঠক শেষে দেশের সার্বিক শিশু অধিকার রক্ষা এবং নির্যাতন প্রতিরোধে নীতিনির্ধারকদের বিবেচনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ১০ দফা যৌথ সুপারিশমালা বা এজেন্ডা পেশ করা হয়। সুপারিশগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

বাধ্যতামূলক চাইল্ড প্রোটেকশন পলিসি: দেশের প্রতিটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

তৃণমূল কেস ম্যানেজমেন্ট ডেস্ক: দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে একটি করে 'চাইল্ড প্রোটেকশন কেস ম্যানেজমেন্ট ডেস্ক' স্থাপন করতে হবে, যা সরাসরি জেলা প্রশাসকের নজরদারিতে থাকবে।

ওয়ান-স্টপ লিগ্যাল ও ফরেনসিক সাপোর্ট: শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুততম সময়ে ফরেনসিক রিপোর্ট প্রদান, পুলিশের দ্রুত তদন্ত এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

হেল্পলাইনের আধুনিকায়ন: জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এর প্রযুক্তিগত ও জনবল কাঠামো সংস্কার করে এর সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করা, যেন যেকোনো প্রান্ত থেকে কল পাওয়ামাত্র তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান চালানো যায়।

শিশু-সংবেদনশীল গণমাধ্যম নীতিমালা: গণমাধ্যমে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে সংবাদ পরিবেশনের জন্য একটি কার্যকর ও সংবেদনশীল জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা।

জাতীয় সচেতনতা ও সেফ টাচ শিক্ষা: পাঠ্যপুস্তকে এবং গণমাধ্যমে ‘সেফ টাচ ও আনসেফ টাচ’ (নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ) এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে অনলাইন নিরাপত্তা বা সাইবার বুলিং বিষয়ে জাতীয় সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা।

কেন্দ্রীয় অপরাধী ডাটাবেস: শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও সাজার বিবরণ সংবলিত একটি 'জাতীয় শিশু নির্যাতনকারী ডাটাবেস' তৈরি করা, যাতে অপরাধীদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ট্র্যাকিং সহজ হয়।

মিডিয়া ফলোআপ রিপোর্টিং: গণমাধ্যমগুলোতে কেবল অপরাধের সংবাদ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ না করে, মামলার শেষ পর্যন্ত কী রায় হলো তা নিয়ে নিয়মিত ফলোআপ রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থা রাখা।

চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ: দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত কর্মরত সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ভুক্তভোগী শিশুদের ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ ও তাদের সাথে সংবেদনশীল আচরণের ওপর বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান।

নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক মোটিভেশন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে নিয়মিত বিরতিতে শিশু অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আইনি অধিকার সংক্রান্ত সচেতনতামূলক সেমিনার বা কার্যক্রম পরিচালনা করা।

গোলটেবিল বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে অংশীজনরা একমত হন যে, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের এই ত্রিমাত্রিক সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়