‘অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ’
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের ধকল কাটিয়ে নতুন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বিগত স্বৈরশাসন কেবল জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি, বরং রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মতো দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাটিকেও প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করে একটি আধুনিক, প্রযুক্তি-নির্ভর ও কর্মমুখী সমাজ গঠন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু সনদ বা সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষার পেছনে না ছুটে তরুণ প্রজন্মকে বাস্তবমুখী যোগ্যতায় গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রবিবার (০৭ জুন) বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচির এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পদ্ধতিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসন ও চরম শোষণের কারণে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা গভীর সংকটে নিমজ্জিত ছিল। তবে অতীতের সেই অন্ধকার পেছনে ফেলে এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। নতুন এই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অবশ্যই শিক্ষাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়াব, ইনশাআল্লাহ।
একই সাথে তিনি দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা রাজপথে জীবন ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে যেসব সাহসী মানুষ দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের প্রকৃত অবদানকে সম্মান জানানোর একমাত্র উপায় হলো একটি বৈষম্যহীন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ রাষ্ট্র উপহার দেওয়া। প্রযুক্তি ও শিক্ষায় নিজেদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে না পারলে আগামী দিনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ছিটকে পড়তে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবী এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং আধুনিক অটোমেশনের অবাধ প্রসার মানুষের সামনে যেমন নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, ঠিক তেমনি উন্মোচন করেছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। এআই চালিত প্রযুক্তির কারণে হয়তো অনেক সনাতন বা পুরোনো পেশা সংকুচিত হচ্ছে কিংবা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে, কিন্তু সমান্তরালভাবে তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ নতুন কাজের ক্ষেত্র।
এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবকে সফলভাবে মোকাবিলা করতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কারিকুলামকে সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী, বহুমুখী ও প্রযুক্তি-নির্ভর করার কাজ ইতিমধ্যে শুরু করেছে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, শিক্ষা কারিকুলামের পরিমার্জন এবং সংস্কার কোনো স্থবির বিষয় নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই বাস্তবতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজারের উপযোগী ও আধুনিক করার যে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে, চলমান শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তারই একটি সফল দৃষ্টান্ত।
শিক্ষার্থীদের আধুনিক শ্রমবাজারের উপযোগী করতে কোন কোন বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, বর্তমান যুগে কেবল প্রথাগত সিলেবাস দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কারিকুলাম কল্পনা করা যায় না। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়তে এখন আবশ্যকীয়ভাবে কিছু 'সফট স্কিল' ও আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান যুক্ত করতে হবে।
তিনি বিশেষায়িত বিষয় হিসেবে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেন:
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেনসিক সায়েন্স এবং অ্যাডভান্সড কম্পিউটার প্রোগ্রামিং।
ব্যবসায়িক ও যোগাযোগ দক্ষতা: ডিজিটাল এন্টারপ্রেনরশিপ (উদ্যোক্তা নীতি), ডিজিটাল কমিউনিকেশন, ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি (আর্থিক জ্ঞান), প্রেজেন্টেশন স্কিল, লিডারশিপ (নেতৃত্বের গুণাবলি) এবং কগনিটিভ এম্পাওয়ারমেন্ট।
ভবিষ্যতের ফ্রন্টলাইন টেকনোলজি: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস, মেটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানোটেকনোলজি, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং নেক্সট জেনারেশন টেকনোলজি।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, তরুণ প্রজন্ম যদি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে উদাসীন থাকে বা রাষ্ট্র যদি তাদের এগুলো শেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দিনে কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দেশের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ভূমিকার কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, সারাদেশে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ২ হাজারের চেয়েও বেশি, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ইতিমধ্যে এই ব্যবস্থা থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করে বলেন, শহর কিংবা গ্রামের সাধারণ পরিবারের সন্তানরা যাতে নিজ নিজ এলাকায় থেকে সহজে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সমস্যা-সংকট দূর হয়, সেই লক্ষ্য নিয়েই ১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই বিশাল শিক্ষার্থী বাহিনীকে দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে লাখ লাখ স্নাতক বের হলেও তারা কেন বেকার থাকছেন, তার মূল কারণ চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি অর্জন করলেও ব্যবহারিক, প্রায়োগিক কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এই সংকট কাটাতে বর্তমান সরকার ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া লিংকেজ বা শিল্পখাত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার সমন্বয়কে একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে চায়।
শিক্ষাজীবন শেষ করেই যেন তরুণদের বেকারত্বের অভিশাপ বইতে না হয়, সে জন্য সরকার কিছু সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বলে জানান সরকারপ্রধান।
শিক্ষাবস্থায় কর্মদক্ষতা: প্রাথমিকভাবে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষাকালীন অবস্থাতেই এপ্রেন্টিসশিপ (শিক্ষানবিশ) ও ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে সরাসরি কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।
ক্যাম্পাসেই উদ্যোক্তা সৃষ্টি: তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে ছোটানোর মানসিকতা থেকে বের করে এনে চাকরিদাতা বা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন ও ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়ার মালিকদের খোঁজে ক্যাম্পাসগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘সিড ফান্ডিং’ বা ‘ইনোভেশন গ্রান্ট’ (উদ্ভাবনী অনুদান) প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষ করে চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে, নিজে উদ্যোক্তা হয়ে আরও বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিক্ষা কেবল ব্যক্তির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা রাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার নয়; এটি বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরির প্রধান নিয়ামক। তবে এই প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের সমান্তরালে নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ দেশের শিক্ষাবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের সামনে যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বসে আছে, তাদের কেবল দক্ষ রোবট বানালে চলবে না। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির নির্ভরতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিক স্বাস্থ্য ও মূল্যবোধের উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোর প্রতি আরও বেশি যত্নশীল ও গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই দেশ একজন দক্ষ নাগরিকের পাশাপাশি একজন প্রকৃত ভালো মানুষ পাবে এবং দেশ সত্যিকার অর্থে আত্মনির্ভরশীল হয়ে এগিয়ে যাবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








