অর্ধদিবস বিদ্যুৎহীন দেশ: চরম বিপর্যয়ে জনজীবন
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও জ্বালানি ও কয়লা সংকটের কারণে দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে। শহরাঞ্চলে তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো এলাকায় ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে শিক্ষা, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জনজীবনের প্রায় সব খাতেই মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
সরকারি তথ্যমতে, জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে এই ঘাটতি আরও প্রকট। চলমান গ্যাস, জ্বালানি তেল ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে পটুয়াখালীর নোরিনকো কেন্দ্র সীমিত উৎপাদন করছে এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ থাকায় চাপ বেড়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ যেখানে এক হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল, তা কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম, আর তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উচ্চ ব্যয়ের কারণে পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। বকেয়া বিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোয় জ্বালানি আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে পল্লি অঞ্চলে। লোড ব্যবস্থাপনার নামে শহরে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা রেখে গ্রামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হচ্ছে। ফলে পল্লির মানুষ কার্যত বিদ্যুৎবঞ্চিত হয়ে পড়ছেন।
খুলনার কয়রা উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। অনেক এলাকায় দিনে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরবর্তী দুই থেকে তিন ঘণ্টা থাকে না। রাতেও একই চিত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা কাজ চালাতে পারছেন না এবং সাধারণ মানুষ গরমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ফটোকপি, ওয়েল্ডিং কিংবা ইলেকট্রনিকস মেরামতের মতো বিদ্যুৎনির্ভর কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়রায় দৈনিক চাহিদা প্রায় ১০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ মেগাওয়াট, কখনো এর চেয়েও কম। এছাড়া পুরোনো সঞ্চালন লাইন, যন্ত্রপাতির ত্রুটি এবং সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।
বরিশাল ও ঝালকাঠিতেও একই চিত্র। নববর্ষের দিন অনেক এলাকায় প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। পিক আওয়ারে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ বাড়ছে না। বরিশাল অঞ্চলে যেখানে চাহিদা ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াট। ফলে ফিডারভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে নিয়মিত।
রংপুর বিভাগে শহরের তুলনায় গ্রামে পরিস্থিতি বেশি খারাপ। গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ প্রায় অর্ধেক। কৃষকরা সেচ দিতে না পারায় বোরো চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগে নাটোর, নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না, গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং গৃহস্থালি কাজেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: পারমাণবিক বিদ্যুতের পথে বড় অগ্রগতি, কমিশনিং লাইসেন্স পেল রূপপুর
সিলেট বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। অনেক উপজেলায় দিনের অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকটি উপজেলায় ৪৫ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ঢাকা বিভাগেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। জেলা শহরগুলোতে কিছুটা সহনীয় থাকলেও পল্লি এলাকায় দিনে ছয় থেকে আটবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রিন্টিং প্রেস, ইটভাটা ও কৃষি খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে, কারণ বিদ্যুৎ না থাকলে মোটর চালিয়ে পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
খুলনা বিভাগে সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও মাগুরা অঞ্চলে লোডশেডিং তুলনামূলক বেশি। কোথাও কোথাও প্রতি দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একই সময়ে শহরে লোডশেডিং কম হলেও গ্রামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
ময়মনসিংহ বিভাগে মাছচাষিরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। পুকুরে নিয়মিত পানি সরবরাহ না থাকায় মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় কৃষিক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে চাহিদার তুলনায় বেশি থাকলেও জ্বালানি সংকট, আর্থিক চাপ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাস্তবে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়া হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে গ্রামাঞ্চল।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, বন্ধ থাকা ইউনিটগুলো চালু হলে এবং জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনজীবনের ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








